কত কে আসিল কত বা আসিছে কত বা আসিবে হেথা
ওপারের লোক নামলে পশরা ছুটে এপারের ক্রেতা।
শিশির বিমল-প্রভাতের ফল,
শতহাতে সহি পরখের ছল
বিকালবেলায় বিকায় হেলায় সহিয়া নীরব ব্যথা।
হিসাব নাহিরে-এলো আর গেলো কত ক্রেতা বিক্রেতা…..

কবিতার পঙতিগুলো শৈশব থেকেই অদ্ভুতভাবে বৈরাগ্য , প্রায় সন্ন্যাস, পরিব্রাজক, শূন্য জীবনের অভিব্যক্তি আমার হৃদয়ে, মননে অঙ্কন করে গেছে। হাট একসময়ে কখনো কখনো বর্তমানে গ্রাম্য জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে কলকাতার উপকণ্ঠের কোনো গ্রাম বা প্রান্তিক কোনো গ্রাম। অহল্যাভূমি পুরুলিয়ার এর থেকে পৃথক কিছু নয়। সুহ্ম , তাম্রলিপ্ত, তেলকুপি, রাঢ় দেশ, ব্রজভূমি ইত্যাদি নিয়ে তো বহু লিখেছি। কিন্তু পুরুল্যার হাট নিয়ে কোনো দিন লিখিনি। #হাট এই শব্দটি শুনলে এখন শহুরে ইংরেজি বলা এক্স জেনারেশন মুখ টিপে হাসবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন #হাট এই বিষয়টি সম্পূর্ণ ভারতের ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে বহন করে নিয়ে চলে। এখন পদ্মাপাড়ে রবি ঠাকুরের শুক্কুর বারের হাট এখন আর বসে না।তবে বসে, পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের বহু প্রান্তিক গ্রামে হাট বসে। সেখানে আজও জিনিসপত্র জুটিয়ে এনে কেনা বেচা হয়।

চ ছ জ ঝ দলে দলে

                            বোঝা নিয়ে হাটে চলে

হাট পৃথিবীর আদিম শপিংমল। হাসছেন? ভুল বললাম কিছু? কতক গাঁ গেরাম মিলিয়ে একটা মন্দির, কি গাছ, কি বন, কিংবা নদী বা পুকুরকে কেন্দ্র করে হাট বসত এবং বসে। সপ্তাহে একদিন কি দু-দিন হাট বসে , অথবা কোথাও মাসে দুবারI হাটে গ্রামের মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় করে I ওই যে কবিগুরু বলেছেন –

আশ্বিনে হাট বসে ভারী ধূম ক’রে,

মহাজনী নৌকায় ঘাট যায় ভ’রে—

হাঁকাহাঁকি ঠেলাঠেলি মহা সোরগোল,

পশ্চিমী মাল্লারা বাজায় মাদোল।

গ্রামের মানুষের মিলনস্থল ও এই হাট। সপ্তাহের বিশেষ বিশেষ দিনে দূর- দুরান্তের মানুষের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয় ; সুখ- দুঃখের কত ভাব-বিনিময় চলে এবং কতখবরাখবর লেনদেন হয় এর – ওরমাধ্যমে। খােলা জায়গায়,নদী বা রাস্তার ধারে এই হাটবসে। কিছু গাছগাছড়া এখানেসেখানে ছায়া নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝে ছড়িয়েথাকে অনেক দোচালা ঘর।ভোরের আলাে ফুটতে না ফুটতেইদোকানিরা আসে;আসে কত গ্রামের মানুষ—কেউ শাকসবজি, আনাজ-তরকারি, কেউ নিত্য প্রয়ােজনীয় জিনিস কিনতে।আর আসে পাইকাররা গ্রামের হাট থেকে নিত্য প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্র সস্তায় কিনে শহরের বাজারে চালান করতে। এ রীতি সে কোন আদিম কাল থেকে চলে আসছে। ওই দিনগুলো গাঁয়ের মানুষের রোজগারের দিন, খুশির দিন, আবার কারো কাছে দুঃখেরও দিন।

তারে জনম – ভর একবার
দেখলাম নারে ॥
নড়ে চড়ে ঈশানকোণে ,
দেখতে পাইনে এ নয়নে ,
হাতের কাছে যার
ভবের হাট – বাজার
ধরতে গেলে হাতে পাইনে তারে ।
সবে কয় সে প্রাণপাখী— শুনে চুপে চুপে থাকি ,
জল কি হুতাশন মাটি কি পবন
কেউ বলে না একটা নির্ণয় ক’রে ॥

গাঁ ঘরে সাপ্তাহিক হাটগুলিই বাজার। সেখানকার অর্থনৈতিক জীবনের খন্ডিত খন্ডিত চলচ্ছবি। ছোট বেলায় বাবা , কাকার হাত ধরে হাটে যেতাম। সরশুনার হাট পুরোনো হাট। সরশুনা অঞ্চল এক সময় রাজা প্রতাপাদিত্যের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ছোট্ট থেকে কত দিন ,কত বছর যে এই হাটকে আমি দেখেছি। এখন সরশুনা কলকাতার মধ্যে বিত্তশালী স্থান হয়ে গেছে। প্রান্তিক গাঁ গঞ্জের হাটে যাবেন, খুব অন্য অনুভূতি হবে আপনার। সে সব জায়গায় গিয়ে হাটুরেদের সঙ্গে কথা বলবেন। পণ্য হাতে ক্রেতা হয়ে দরাদরি করবেন। গ্রামবাসীদের সঙ্গে বন্ধু হয়ে গাঁ ঘরে গিয়ে ঠান্ডা চালা গাছের ছায়ায় বসবেন। দেখবেন মনে হবে আপনিই পৃথিবীর অন্যতম ধনী ব্যক্তি। সে ধন আপনার সুখ, আনন্দের ধন , সে ধনসম্পদ আপনি স্মৃতির মণিকোঠায় বহন করে নিয়ে ঘরে ফিরবেন। তার ভাগের অধিকার আর কারো থাকবে না। পাল্টে পাল্টে যাবে আপনার যাত্রার অভিমুখ। গাঁ ঘরের হাট গুলো কেবলমাত্র পণ্যক্ষেত্রই নয়, আপাত বাণিজ্যের অন্তরালে তা কিভাবে জীবনের যোগসূত্র রচনা করে।

পুরুল্যা জেলাতেই গাঁ গেরামের সংখ্যা সহস্রাধিক। সব গাঁ গেরামে তো আর হাট বসে না । তাই পুরুল্যার জেলার এক একটি হাট তার পারিপার্শ্বিক বহু গাঁয়ের মানুষদের মিলনপীঠ হয়ে দাঁড়ায়। এই সকল হাটে যেমন আমদানি হয় বিচিত্র পণ্য, তেমনি বিচিত্রধারার গাঁয়ের মানুষেরও অভাব থাকে না এখানে। ঝুমৈরা, নাচনি, হাপু , বহুরূপী থেকে শুরু করে গাঁজাড়ি, জুয়াড়ি মায় ছিঁচকে চোর, ধরিবাজ পাইকার ও সরল বিক্রেতা।

পুরুল্যার হাটগুলো যখন বেশ জমে ওঠে, তখন মাথায় ময়ূর পালক গুঁজে, ফেট্টি বেঁধে , কেউ ধামসা মাদল নিয়ে , কেউ বা পিতলের ঢাউস করতাল নিয়ে ঝম্ ঝম্ ! ঝম্ ঝমঝমা ঝম্ … দ্রিম দ্রিম দ্রিম তালে নাচতে নাচতে ধীর লয়ে হাটের মাঝবরাবর এগিয়ে চলে। এদের কেউ কেউ দোকানি, হাটের ক্রেতাদের কাছে গিয়ে মাঙ্গন চায়। ওই টুকুই তো তাদের সম্বল। অনেক দোকানি তাদের জিলিপি, মিষ্টি, লাড়ু, পকড়ি বা আনাজপাতি, পয়সা।

এসব দৃশ্য সব হাটে পাবেন না। রাঢ় বঙ্গের রাঙা ধুলোয় মাখা উদাসী হাওয়ার পথে পথে যেসব হাট বসে সেসব হাটে পাবেন। মানে পুরুল্যা, বাঁকরা, ম্যাদনীপুর, বীরভূমের হাটে পাবেন। বর্ষার শেষে বাদল টুঁটে সাদা মেঘের ভেলায় শাল পিয়ালের সবুজ পাতায় হাওয়া খেলিয়ে সেখানে শরৎ আসে, ব্রহ্মময়ী আসার ঠিক আগে আগে পুরুল্যার সাঁওতালরা এমন করে #ভুয়াং নাচে ,পার্বণী তোলে। তবে সাঁওতাল গাঁ ঘরগুলোর কাছ বরাবর এই উপলক্ষে মেলা বসলে সেখানেও তারা এমন নাচ আর বাদ্যিবাজনা করে চকিতে মাতন এনে দেয়। এখনে হাড়িয়া , মহুয়া খেয়েও নাচের তালে কোনো ভুল হয় না। মোরগ বা পায়রার লড়াইও বসায় হাটের মধ্যে। তাদের উপর বাজি ধরে অনেকে। অনেকে জেতে ,অনেকে সারাদিনের কামাইটুকু খুইয়ে দিয়ে সর্বশান্ত হয়। সেসব দেখতে কত মানুষ ভিড় জমায়। কেউ কেউ গাছের ডাল বা বাঁশঝাড়ের মাথায় ইঁদুর বেঁধে , দড়িতে টান মেয়ে, সুই সুই করে নাচায়। তাই দেখে হাটুরে মানুষজনের মনে লঘু উচ্ছাস লাগে।

যত ছিল ত্বরিত আহ্বান

পরিচিত সংসারের দিগন্তে হয়েছে অবসান।

       বেলা কত হল, তার

       বার্তা নাহি চারিধার,

               না কোথাও কর্মের আভাস।

       শব্দহীনতার স্বরে

       খররৌদ্র ঝাঁ ঝাঁ করে,

               শূন্যতার উঠে দীর্ঘশ্বাস।

ক্রমশঃ

তথ্যঃ প্রেম ডুরিয়া শাড়ি

©দুর্গেশনন্দিনী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.