মায়োপ্যাথি রোগে আক্রান্ত, শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে একা চলাফেরা করতে অক্ষম—এমনই এক ৩১ বছরের যুবকের হাত ধরে বাংলাদেশ এবং ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা (AQIS)। বাংলাদেশ পুলিশের সন্ত্রাসদমন শাখা ও ভারতীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘ইমাম মাহমুদুরের কাফেলা’ নামক এই নবতম ছায়া সংগঠনের শীর্ষনেতা হলেন জুয়েল মাহমুদ ওরফে জুয়েল আলি।
নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আল কায়েদার নতুন চালিকাশক্তি
বাংলাদেশের নাটোরের বাগাতিপাড়ার নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান জুয়েল। গ্রামের মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর তিনি প্রথমে ইসলামী ছাত্র শিবির ও পরে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশে (জেএমবি) যোগ দেন। ২০১৯ ও ২০২০ সালে জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত থাকার অভিযোগে দু’বার গ্রেফতারও হন তিনি। দ্বিতীয়বার জামিনে মুক্তি পেয়ে পাবনায় নতুন মাদ্রাসা খুলে সেখানে বসেই তৈরি করেন আল কায়েদাপন্থী এই সংগঠন ‘ইমাম মাহমুদুরের কাফেলা’।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, জেএমবি ও আনসারুল্লা বাংলা টিমের মতো আল কায়েদার অন্যান্য ছায়া সংগঠনগুলির সহায়তায় জুয়েল মূলত অনলাইনে ভিডিও ও অডিও বার্তার মাধ্যমে তরুণদের মগজধোলাই এবং জিহাদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতেন। মৌলভীবাজারের পার্বত্য এলাকায় এই সংগঠনের জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে ওঠে। ২০২৩ সালে সেখান থেকে জুয়েলসহ ১৭ জনকে বিস্ফোরক ও অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে বাংলাদেশ পুলিশ। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে পুনরায় জামিনে মুক্ত হন তিনি।
সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে শিকড় এবং নিয়োগের ব্লু-প্রিন্ট
ভারতে এই সংগঠনের উপস্থিতি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে, যখন আসাম পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (STF) বরপেটা ও চিরাং জেলা থেকে ১০ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে। তদন্তে ধৃতদের থেকে ‘পূর্ব আকাশ’ নামের একটি গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপের হদিস মেলে।
আসামে ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, সংগঠনটিতে নিয়োগের প্রক্রিয়া পরিচালিত হতো চরম সতর্কতায়:
- ধাপ ১: অনলাইনে প্রাথমিক আগ্রহ প্রকাশকারীদের ধাপে ধাপে চরমপন্থী প্রচার পুস্তিকা পাঠানো হতো।
- ধাপ ২: বাছাই করা প্রার্থীদের নথি যাচাইয়ের পর ভিডিও বার্তায় ‘বায়াত’ বা আনুগত্যের অঙ্গীকার করানো হতো।
- ধাপ ৩: এরপর তাঁদের এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হতো।
তদন্তকারীদের দাবি, ভারতে সদস্য করা যুবকদের একটি বড় অংশকে পাসপোর্ট তৈরি করতে বলা হয়েছিল। ধৃতদের মধ্যে কয়েকজন মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে বৈধ পথে বাংলাদেশে গিয়ে মৌলভীবাজারের পার্বত্য প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিলেন বলেও অনুমান গোয়েন্দাদের।
এনআইএ-র দেশব্যাপী তল্লাশি ও গ্রেফতারি
মঙ্গলবার এই ভারতবিরোধী মডিউলের খোঁজে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কেরলের মোট ১৬টি স্থানে অভিযান চালায় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। অভিযান চালিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে চারজনকে এবং আসাম থেকে দু’জনকে আটক ও গ্রেফতার করা হয়। ধৃতেরা প্রত্যেকেই ‘পূর্ব আকাশ’ অনলাইন গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং তাঁদের মূল দায়িত্ব ছিল অস্ত্র ও বিস্ফোরক জোগাড় করে বড়সর নাশকতা চালানো।
পশ্চিমবঙ্গের বাজেবাজে এনআইএ-র অভিযানে ধৃত জুম্মান হোসেন শেখকে কলকাতার বিশেষ আদালতে পেশ করা হলে আদালত তাঁর ট্রানজিট রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। এনআইএ-র বিশেষ আইনজীবী শ্যামল ঘোষ জানান, রাজ্য থেকে ধৃত সকলকে ট্রানজিট রিমান্ডে আসামের গুয়াহাটিতে নিয়ে গিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গে এই মডিউলের আরও একাধিক ফেরার সদস্য আত্মগোপন করে রয়েছে, যাদের খোঁজে তল্লাশি জারি রয়েছে।

