দ্বিতীয় পর্ব — মোহভঙ্গ
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় এবং নাটকীয় রাজনৈতিক সামাজিক পরীক্ষার ক্ষেত্র। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব থেকে শুরু করে স্তালিনীয় স্বৈরাচার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী শীতল যুদ্ধ—এই সম্পূর্ণ সময়কাল জুড়ে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ভেতরকার রূপ এবং এর পিছনের ভয়াবহ বাস্তবতা বিশ্বের কাছে খুব কমই স্পষ্ট ছিল। আর ঠিক এই জায়গাতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন ভিক্টর অ্যান্ড্রয়েভিচ ক্রাভচেঙ্কো (Viktor Andreyevich Kravchenko)। ক্রাভচেঙ্কো কেবল একজন সোভিয়েত কর্মকর্তা বা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্তালিনীয় ব্যবস্থার এমন এক প্রত্যক্ষদর্শী যিনি ভেতর থেকে এর প্রতিটি চালচিত্র দেখেছিলেন এবং পরবর্তীতে পশ্চিমা বিশ্বের সামনে এর ভয়াবহ মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন।
একজন খনি শ্রমিক থেকে পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন, এবং পরবর্তীতে একজন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী ও স্তালিন-বিরোধী প্রতীকে পরিণত হন—তা সমসাময়িক সোভিয়েত রাশিয়ার ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ভিক্টর ক্রাভচেঙ্কো ১৯০৫ সালে ইউক্রেনের একরেতেরিনোস্লাভ (বর্তমান দ্নিপ্রো) শহরের এক প্রাক-বলশেভিক বিপ্লবী শ্রমিকের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০৫ সালে রাশিয়াজুড়ে প্রথম ব্যর্থ বলশেভিক ও শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, যার আঁচ ক্রাভচেঙ্কোর পরিবারেও লেগেছিল।
১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে যখন জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পতন ঘটে এবং লেনিনের নেতৃত্বে তথাকথিত ‘অক্টোবর বিপ্লব’ সফল হয়, তখন ক্রাভচেঙ্কো একজন কিশোর। ক্রাভচেঙ্কোর আত্মজীবনী তে জারের আমল থেকে বলশেভিজমের উত্থান আর কমিউনিজমের প্রতি মোহভঙ্গের কাহিনী ক্রাভচেঙ্কো পরিবারের তিন প্রজন্মের তিন পুরুষ অর্থাৎ ক্রাভচেঙ্কো, ক্রাভচেঙ্কোর পিতামহ আর পিতার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ফুটে ওঠে।
ক্রাভচেঙ্কোর পিতা বলশেভিজমের সমর্থক ছিলেন আর ক্রাভচেঙ্কোর পিতামহের জারের প্রতি আনুগত্যের বিপরীতে তার এই অবস্থান কিশোর ক্রাভচেঙ্কোর উপর প্রভাব ফেলে।
The revolutionary events of 1905, recounted by my father and his friends, deepened by my own contact with similar events in later years, so deeply imprinted on my mind that even now I can feel the thundering hoofs of Cossack horsemen trampling the workmen and women of our city.( Page – 6 , A Russian Childhood)
বলশেভিক দল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের পর রাশিয়ার অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে ক্রাভচেঙ্কো বলেছেন — “১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে (পশ্চিমা ক্যালেন্ডারে মার্চের শুরুতে) ঝড়ের মেঘ ফেটে পড়ল। এমনকি যারা এর আগমনের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি নিশ্চিত ছিলেন, তারাও অবাক এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ‘বিপ্লব’—যা এতদিন একটি গোপন ও কিছুটা নিষিদ্ধ শব্দ ছিল—হঠাৎ করেই প্রকাশ্যে এসে এক অদ্ভুত ও ভীতিকর বাস্তবতায় রূপ নিল। যেটিকে সমস্ত সমস্যার একটি সহজ সমাধান বলে মনে হয়েছিল, তা হঠাৎ করেই লাখ লাখ নতুন সমস্যায় বিস্ফোরিত হলো, যার মধ্যে কিছু ছিল খাবার ও জামাকাপড় খোঁজার মতো হাস্যকর রকমের সামান্য।
অভ্যস্ত জীবনের বাঁধনগুলো আলগা হয়ে খুলে গেল। স্কুল, কারখানা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পুরনো অর্থ হারিয়ে ফেলল”।
[The storm clouds burst in the last week of February, 1917 (early March in the Western calendar). Even those who had been most certain of its advent were surprised and bewildered. Revolution, which had been an intimate and half-illicit word, was suddenly in the open, a wonderful and terrifying reality. What had seemed a simple solution of all problems had exploded into a million new problems, some of them ridiculously petty, like finding food and clothes.
The seams of accustomed life came apart. Schools, factories, public institutions lost their old meanings. ( Page – 20 , Glory and Hunger)]
ক্রাভচেঙ্কোর পিতা ,আন্ড্রে তথাকথিত বিপ্লবের আসল রূপ বুঝতে পেরেছিলেন — নিজেকে যেভাবে একটা আদর্শ কে সামনে রেখে উৎসর্গ করেছিলেন সেই আদর্শের নগ্ন রূপ দেখে হতাশ হয়েছিলেন। কিশোর ক্রাভচেঙ্কো কে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টাও করেছিলেন —-“My father grew more depressed, more silent, with every passing day. He became more irritable than I had ever seen him in the years of danger and sacrifice. When I pressed him for an explanation of the many parties and programs he seemed embarrassed.
একসময়ের বলশেভিক, ক্রাভচেঙ্কোর পিতার সাবধানবাণী —-
“It’s too complex,” he would say. “You’re not old enough to understand. This is a struggle for power. No matter what any party stands for, it will be bad if one party wins. That will only mean new masters for the old-rule by force, not by the free will of the people. It is not for this that the revolutionists gave their lives.”(Glory and Hunger)
জার্মানদের থেকে রাশিয়ানরাই রাশিয়ানদের মেরেছে বিপ্লবের নামে, সমাজে অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র খাড়া করার নামই ‘কমিউনিজম’। একসময়ের জারভক্ত ক্রাভচেঙ্কোর পিতামহের , তার ছেলে অর্থাৎ ক্রাভচেঙ্কোর পিতার কাছে আক্ষেপ —
“The Germans didn’t kill us like our own Russian brothers are doing. Thank you, thank you, Andrei, for your dear revolution.”
(Glory and Hunger ,I choose freedom )
পরে কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগদানের জন্য বারবার বলা হলেও ক্রাভচেঙ্কো পরিবারের মধ্যম পুরুষ টি কমিউনিজম থেকে তফাতেই থেকেছেন। কিন্তু যুবশক্তির কর্ম-চঞ্চলতা স্বপ্ন চায় , একটা আদর্শ কে সামনে পেলে কষ্ট স্বীকার করতেও পিছপা হয় না —- শুধু যদি একবার আদর্শ মনে গাঁথে। সেই সময়ের সোভিয়েত রাশিয়ায় কার বলার সাহস আছে কমিউনিজমের মরিচীকার আসল চেহারা ? ঘোষিত Dictatorship চলছে সর্বহারাদের।
কোনো গোষ্ঠীর দখলে সমস্ত ক্ষমতা থাকলে তারা সর্বহারা হয় কি করে ? কিন্তু সাধারণ মানুষ যুক্তি দিয়ে মত প্রতিষ্ঠার অধিকার পায় গণতান্ত্রিক দেশে — কিন্তু এ তো ঘোষিত স্বৈরতন্ত্র! সবাই যাতে সমানাধিকার পায় তার জন্য ভিন্ন মত ব্যক্ত করার অধিকার কেড়ে নিতে হবে — হ্যাঁ, এরই নাম ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র আর এই বিজ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্র সোভিয়েত রাশিয়া।
দুই প্রজন্মের মধ্যে মতপার্থক্য প্রত্যেক যুগের বৈশিষ্ট্য কিন্তু অভিজ্ঞতা কে মূল্য না দিলে কত বড় মূল্য দিতে হয় তা ক্রাভচেঙ্কোর পিতার মতো ক্রাভচেঙ্কো নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছিলেন।
গরীব, অভুক্ত রাশিয়া কে উন্নত ও বৈষম্যহীন দেশে পরিণত করতে মার্ক্সবাদ – লেনিনবাদের তত্ত্ব তরুণ মনে জায়গা করে নেয় —- বাড়ির আপত্তি সত্ত্বেও দোনেৎসক এর কয়লাখনি তে কাজ শুরু করেন ক্রাভচেঙ্কো। সমস্ত সংবাদপত্রে দেশবাসীর কাছে কয়লা উত্তোলন আর শস্য উৎপাদনের আকুতি , লেনিন -ট্রটস্কি তখন ক্রাভচেঙ্কোর কাছে ঈশ্বরতুল্য।
১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, প্রকৌশলবিদ্যার ছাত্র এবং কারখানার তরুণ শ্রমিক হিসেবে ক্রাভচেঙ্কো কমসোমোলে যোগদান করেন।কমসোমোলের একজন অত্যন্ত মেধা সম্পন্ন এবং কর্মঠ সদস্য হিসেবে তিনি তরুণ সমাজকে সাম্যবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষায় জোর দিতে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন।
কমসোমোল ক্লাবে নিয়মিত মিটিং এবং লেকচারে তিনি অংশ নিতেন। সেখানে দলের নীতি ও মার্ক্সবাদী মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা হতো, যা তৎকালীন তরুণদের মানসিক বিকাশে বড় প্রভাব ফেলত।পার্টি ও কমসোমোলের নির্দেশে হাজার হাজার শহুরে তরুণকে গ্রামে পাঠানো হয় কৃষকদের কাছ থেকে শস্য বাজেয়াপ্ত করতে এবং ‘কুলাক’ (ধনী কৃষক) উচ্ছেদ অভিযানে। ক্রাভচেঙ্কোকেও একই ধরনের দায়িত্বে ইউক্রেনের গ্রামাঞ্চলে যেতে হয়।
কমসোমোল ক্যাডারদের যে নিষ্ঠুরতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা দেখে ক্রাভচেঙ্কোর বিবেক কেঁপে ওঠে। তিনি দেখেন, কীভাবে অনুগত কমসোমোল কর্মীরা নিজেদেরই দেশবাসী দরিদ্র কৃষকদের ঘর থেকে শেষ রুটির টুকরোটি কেড়ে নিচ্ছে, যার পরিণতিতে সৃষ্টি হয় ১৯৩২-৩৩ সালের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ বা হলোদোমোর (Holodomor)।
১৯২৯ সালে ভিক্টর ক্রাভচেঙ্কো কমসোমোল (Komsomol — যুব কমিউনিস্ট লীগ) থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টি (CPSU — Communist Party of the Soviet Union)-র সদস্য হন। তাঁর নিজের কথায় —
“In the middle of 1929 I was admitted to the Party. It seemed to me the greatest event in my life. It made me one of the élite of the new Russia. I was no longer an individual with a free choice of friends, interests, views. I was dedicated forever to an idea and a cause. I was a soldier in a highly disciplined army in which obedience to the center was the first and almost sole virtue. To meet the wrong people, to listen to the wrong words, thereafter would be inadmissible.” (Page -55 , Youth in Red)।
অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি সাধারণ মানুষের যে রাশিয়ায় যে কারাগার বানিয়েছিল পার্টি তন্ত্রটাও একটা কারাগারের মতোই ছিল যেখানে পার্টিই শেষ কথা।
১৯৩১ এ খারকভ-এ একজন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র হিসেবে ক্রাভচেঙ্কো ভর্তি হন। কিভাবে বামপন্থী ইকোসিস্টেম তরুণ মেধাবী মস্তিষ্কে মার্ক্স -লেনিন ঢুকিয়ে দেয় , ক্রাভচেঙ্কোর স্মৃতিচারণা থেকে স্পষ্ট হয় —- “আমাদের পাঠ্যক্রমে কারিগরি বিষয়ের চেয়ে রাজনৈতিক শিক্ষাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। সরকার কেবল প্রকৌশলী নয়, বরং ‘সোভিএত ভাবধারার প্রকৌশলী’ তৈরি করতে চেয়েছিল। লাল অধ্যাপক ফিলিপভের নেতৃত্বে আমাদের লেলিনবাদ বিভাগ আমাদের একদম নিয়মমাফিক চলতে বাধ্য করত। যারা মার্ক্সের দাস ক্যাপিটাল, এঙ্গেলসের দ্বন্দ্ববাদ, লেনিনের রচনাবলী এবং সর্বোপরি স্টালিনের গবেষণাপত্র হজম করতে পারত না, তাদের ইনস্টিটিউট থেকে এত দ্রুত বের করে দেওয়া হতো যা ক্যালকুলাস বা ব্লুপ্রিন্ট নিয়ে সমস্যায় পড়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও ঘটত না”।
[“Political education rated even higher in our curriculum than technical subjects. What the government was after was not simply engineers but Soviet-minded engineers. Our Leninism Faculty, with the Red Professor Fillipov at its head, made us toe the mark. Those who could not digest Marx’s Das Kapital, the dialectics of Engels, the works of Lenin and abov all, the dissertations of Stalin, were thrown out of the Institute so quickly than those who merely had trouble with calculus or blueprints.” ( Page – 61 , A Student in Kharkov )।]
মস্কোর কমিসারিয়েটে ক্রাভেচঙ্কোর সাথে সোভিয়েত রাজনীতির দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব—সের্গো অর্জোনিকিডজে (Sergo Ordzhonikidze) এবং নিকোলাই বুখারিন (Nikolai Bukharin)-এর সাক্ষাৎ ঘটে। সেই সময়ে বুখারিন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাব ছিল অমলিন। ক্রাভেচঙ্কো অত্যন্ত সাহসের সাথে শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ওপর জোর দেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, নতুন কারখানা তৈরির চেয়ে পুরোনো কারখানার উন্নয়ন এবং মানুষের মৌলিক চাহিদার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান) প্রতি নজর দেওয়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
অর্জোনিকিডজে এবং বুখারিন উভয়েই তাঁর এই ‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ ও সোজাসাপ্টা কথার প্রশংসা করেন। অর্জোনিকিডজে স্বীকার করেন যে, সমস্যাটি তাঁরা জানলেও তার সমাধান অত্যন্ত জটিল।ইউক্রেনে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা ১৯৩২-৩৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ কৃষকের করুণ মৃত্যু এবং রাষ্ট্রীয় বাজেয়াপ্তকরণের নির্মম দৃশ্য তিনি স্বচক্ষে দেখেন। সাধারণ কৃষকদের ওপর পার্টির বলপ্রয়োগ দেখে কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি তাঁর প্রথম গভীর মোহভঙ্গ ঘটে।সেখানে তিনি দেখেন কীভাবে স্ট্যালিনের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অবাস্তব উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে প্রযুক্তির অপব্যবহার করা হচ্ছিল এবং সামান্য ভুলের জন্য সাধারণ প্রকৌশলীদের ওপর দোষ চাপানো হতো।
মস্কোর কমিসারিয়েটে ক্রাভেচঙ্কোর সাথে সোভিয়েত রাজনীতির দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব—সের্গো অর্জোনিকিডজে (Sergo Ordzhonikidze) এবং নিকোলাই বুখারিন (Nikolai Bukharin)-এর সাক্ষাৎ ঘটে। সেই সময়ে বুখারিন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাব ছিল অমলিন। ক্রাভেচঙ্কো অত্যন্ত সাহসের সাথে শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ওপর জোর দেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, নতুন কারখানা তৈরির চেয়ে পুরোনো কারখানার উন্নয়ন এবং মানুষের মৌলিক চাহিদার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান) প্রতি নজর দেওয়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ।আলোচনা শেষে ক্রাভেচঙ্কোকে পাঁচ দিনের ছুটি, এক হাজার রুবল এবং বলশয় থিয়েটারের টিকিট উপহার দেওয়া হয়। মেট্রোপোল রেস্তোরাঁর বিলাসিতা এবং ক্ষমতার বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত জীবন তাঁকে মুহূর্তের জন্য বিমোহিত করে। তিনি নিজের মনেই প্রশ্ন তোলেন—যদি মস্কোর এই বিলাসবহুল জীবন এবং প্রাচুর্য তাঁকে ঘিরে থাকে, তবে কি তিনি নিকোপোলের সেই ধুলোবালি আর ঘর্মাক্ত শ্রমিকদের কষ্টের কথা ভুলে যাবেন? ক্ষমতার এই ‘মধুচক্র’ কীভাবে একজন মানুষের বিবেককে স্তব্ধ করে দিতে পারে, তা ক্রাভেচঙ্কোর চিন্তায় স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।মস্কো ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে ক্রাভেচঙ্কো তাঁর প্রাক্তন শিক্ষক ও আদর্শিক গুরু কমরেড লাজারেভের সাথে দেখা করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি এক ভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। একসময় যে লাজারেভ পার্টি ও আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন, ইউক্রেনের বাধ্যতামূলক কৃষি যৌথকরণের (Collectivization) ভয়াবহতা দেখে তিনি তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
লাজারেভ বর্ণনা করেন কীভাবে মলোটভ (Molotov)-এর নির্দেশে নিষ্ঠুরভাবে কৃষকদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিপ্লবকে নিরাপদ করার অজুহাতে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানিকে সেখানে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। লাজারেভের ভাষায়, পুরোনো রাজতন্ত্রের জায়গা নিয়েছে এক নতুন ‘অভিজাত শ্রেণি’, যারা আদর্শের নামে সাধারণ মানুষের ওপর চরম অত্যাচার চালাচ্ছে।
ক্রাভেচঙ্কোর এই অভিজ্ঞতা এক গভীর সত্যকে উন্মোচিত করে। একদিকে মস্কোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে চলা তাত্ত্বিক আলোচনা ও বিলাসিতা, অন্যদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের রক্ত ও কান্নার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা। এই বৈপরীত্যই ক্রাভেচঙ্কোর মনে সোভিয়েত ব্যবস্থার প্রতি প্রথম বড় ধরণের সংশয় ও বিতৃষ্ণা তৈরি করে।
লাজারেভ স্ট্যালিনের আমলাতান্ত্রিক অন্ধ ভক্তদের মতো ছিলেন না; তিনি বিশ্বাস করতেন আসল কমিউনিজম তৈরি হবে বাস্তব শিল্পায়ন, বিজ্ঞান এবং মানুষের কল্যাণের মাধ্যমে। তাঁর এই বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সত্যবাদিতা ক্রাভচেঙ্কোকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ক্রাভচেঙ্কো লাজারেভকে কমিউনিস্ট ব্যবস্থার নৈতিক মুখ হিসেবে দেখতেন। লাজারেভের বক্তৃতা শুনেই যুবক ক্রাভচেঙ্কো কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।রাষ্ট্র ও পার্টির প্রতি আজীবন বিশ্বস্ত থাকা সত্ত্বেও লাজারেভকে হঠাৎ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ট্রটস্কিপন্থী চক্রান্ত এবং “রাষ্ট্রদ্রোহিতা”র কাল্পনিক অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।লাজারেভের মতো একজন সৎ ও অনুগত নেতার রাতে হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়া ক্রাভচেঙ্কোর বিশ্বাসকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়। ক্রাভচেঙ্কো বুঝতে পারেন যে এই ব্যবস্থার কাছে আদর্শ, সত্য বা আনুগত্যের কোনো মূল্য নেই—স্ট্যালিনের স্বৈরাচারী ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই এখানে শেষ কথা।
১৯৩২-৩৩ সালের সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (যাকে বর্তমানে ‘হলোডোমোর’ বলা হয়)। ক্রাভচেঙ্কো বর্ণনা করেছেন কীভাবে গ্রামের পর গ্রাম মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছিল। কারখানার শ্রমিকরাও ছিল অর্ধাহারী এবং কঙ্কালসার। মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় ঘাস এবং গাছের ছাল পর্যন্ত খাচ্ছিল, অথচ রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় তখন শিল্পায়নের ‘বিজয়গাথা’ গাওয়া হচ্ছিল। ক্রাভচেঙ্কো নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন — “একত্রীকরণের (কালেক্টিভাইজেশন) প্রথম লভ্যাংশ ছিল মৃত্যু। যদিও এই ট্র্যাজেডি নিয়ে সংবাদপত্রগুলোতে একটি শব্দও ছাপা হয়নি, তবুও সমগ্র দক্ষিণ রাশিয়া ও মধ্য এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্ভিক্ষ ছিল এক সর্বজনবিদিত সত্য। যেটিকে আমরা চরম সত্য বলে জানতাম, সেটিকেই প্রকাশ্যে “সোভিএত-বিরোধী গুজব” বলে নিন্দা জানাতাম”।
[“The first dividends of collectivization were death. Although not a word about the tragedy appeared in the newspapers, the famine that raged throughout southern Russia and Central Asia was a matter of common knowledge. We denounced as “anti-Soviet rumors” what we knew as towering fact. ( Harvest in Hell , I choose freedom)]
নিকোপোলে থাকাকালীন ক্রাভচেঙ্কো সোভিয়েত গোপন পুলিশ বা জিপিইউ-র নিষ্ঠুরতা কাছ থেকে দেখেন। কারখানায় সামান্য ত্রুটি বা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে তাকে ‘নাশকতা’ (Sabotage) হিসেবে গণ্য করা হতো। প্রকৌশলী ও দক্ষ শ্রমিকদের ওপর সারাক্ষণ নজরদারি চলত এবং অনেককেই রাজনৈতিক অজুহাতে গ্রেপ্তার করে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হতো।
স্থানীয় পার্টি নেতারা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে মস্কোর কাছে মিথ্যা রিপোর্ট পাঠাতেন। সত্য গোপন করা এবং কাল্পনিক সাফল্যের খতিয়ান তৈরি করাটাই ছিল তখনকার নিয়ম। ক্রাভচেঙ্কো যখনই বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরতেন, তখনই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হতো।একজন কমিউনিস্ট হিসেবে ক্রাভচেঙ্কো এক গভীর নৈতিক সংকটে পড়েন। তিনি একদিকে চেয়েছিলেন নিজের কারিগরি দক্ষতা দিয়ে দেশের উন্নয়ন করতে, কিন্তু অন্যদিকে তিনি দেখছিলেন যে এই ‘উন্নয়ন’ সাধারণ মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নিকোপোলের অভিজ্ঞতা তাঁর মনে কমিউনিস্ট পার্টির শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে প্রথম বড় ধরনের সন্দেহের বীজ বুনে দেয়।
স্ট্যালিনের ‘গ্রেট পার্জ’-এর সময় ১৯৩৭ সালে এনকেভিডি (NKVD) তাঁকেও মধ্যরাতে হঠাৎ গ্রেপ্তার করে নিপ্রোপেত্রোভস্কের কারাগারে নিয়ে যায়।তাঁর বিরুদ্ধে “ট্রটস্কিপন্থী চক্রান্ত” ও “শিল্প ক্ষেত্রে অন্তর্ঘাত” (Saboteur)-এর কাল্পনিক অভিযোগ আনা হয়। অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সত্ত্বেও তিনি কোনো মিথ্যা স্বীকারোক্তিতে সই করেননি। উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে কয়েক মাস পর তিনি অলৌকিকভাবে মুক্তি পান।১৯৩৪ সালের শুরুতে সোভিয়েত নেতা লাজার কাগানভিচ ঘোষণা করেছিলেন যে, দল থেকে ১,৮২,৫০০ জন (পরবর্তীতে যা ২ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়) সদস্যকে তাড়িয়ে পার্টিকে ‘শুদ্ধ’ এবং ‘মনোলিথিক’ (একশিলা বা অভিন্ন) করা হয়েছে। কিন্তু লেখকের চূড়ান্ত উপলব্ধি এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে।
যাঁরা এই পরীক্ষায় টিকে গিয়েছিলেন (যেমন লেখক নিজে), তাঁরা দলের ওপর থেকে ভেতর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। বাইরে কমরেড স্টালিনের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের জোয়ার আর করতালির শব্দ থাকলেও, ভেতরে ভেতরে হাজার হাজার সদস্য ছিলেন চরম সংশয়ী, ভীত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এই শুদ্ধি অভিযান পার্টিকে শক্তিশালী করেনি, বরং তার মানবিক ভিত্তি এবং সততাকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
পিন্টু সান্যাল


