যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটেনি উত্তাপ: তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যানের ইস্তফা, সংঘাতের আবহে সোমবার খুলছে ক্যাম্পাস

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটেনি উত্তাপ: তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যানের ইস্তফা, সংঘাতের আবহে সোমবার খুলছে ক্যাম্পাস

গত বুধবার নৈশ হিংসার পর তিন দিন অতিক্রান্ত হলেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে উত্তেজনা কমেনি। ঘটনার প্রেক্ষিতে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছেন নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক শুভশঙ্কর সরকার। ফলে তদন্ত প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে সোমবার কমিটির নতুন চেয়ারম্যান বাছাই করা এবং ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা পর্যালোচনার লক্ষ্যে একগুচ্ছ জরুরি বৈঠকে বসতে চলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

পঠনপাঠন স্বাভাবিক করার চেষ্টা ও একগুচ্ছ প্রশাসনিক বৈঠক

ক্যাম্পাসের ভিতরে ও বাইরে অশান্তির জেরে গত বৃহস্পতিবার থেকে প্রায় সমস্ত বিভাগেই পঠনপাঠন বন্ধ ছিল। শনি ও রবিবারের সাপ্তাহিক ছুটির পর সোমবার ফের খুলছে বিশ্ববিদ্যালয়। এদিন থেকে সমস্ত বিভাগে স্বাভাবিক পঠনপাঠন চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সংঘাতের আবহ পুরোপুরি কাটেনি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সোমবার দুপুর ১২টায় নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের আবাসন সংক্রান্ত বিষয়ে ‘স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার বোর্ড’-এর সঙ্গে বৈঠকে বসবেন কর্তৃপক্ষ। এর পর দুপুর ৩টেয় উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের উপস্থিতিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক যৌথ পর্যালোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান ইস্তফা ও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ

তদন্ত কমিটির প্রধান বাছাই করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। গত শনিবার আরএসএস সমর্থিত শিক্ষক সংগঠন ‘অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ’ (এবিআরএসএম) অধ্যাপক শুভশঙ্কর সরকারের নিয়োগ নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করেছিল। তাদের দাবি ছিল, অতীতের শিক্ষক নিয়োগ বিতর্ক সংক্রান্ত বিষয়ে ওনার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানাচ্ছে, সংগঠনটির বিরোধিতা প্রকাশ্যে আসার আগেই অধ্যাপক সরকার ইমেল মারফত তদন্ত ভার গ্রহণে নিজের অনিচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন।

অন্যদিকে, ক্যাম্পাসের গোলমালে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার প্রায় ৩৭ ঘণ্টা পর শুক্রবার দুপুরে যাদবপুর থানায় ইমেল মারফত লিখিত অভিযোগ দায়ের করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বাম ছাত্র সংগঠনগুলি এবং এবিভিপি একে অপরের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করলেও, পুলিশ এখনও পর্যন্ত কাউকে তলব বা জিজ্ঞাসাপাদ করেনি বলে জানা গিয়েছে।

রাজনৈতিক চাপানউতোর: সংঘের মিছিল ও শুভেন্দুকে এসএফআই-এর পাল্টা চিঠি

সোমবার বিকেলে দক্ষিণ কলকাতায় রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ধ্বংসের প্রতিক্রিয়াশীল কমিউনিস্ট চক্রান্ত ব্যর্থ করার’ আহ্বান জানিয়ে বিকেল ৪টেয় দক্ষিণাপণ থেকে ৮বি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত একটি প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) শাখা সংগঠনসমূহ—যার মধ্যে রয়েছে এবিভিপি এবং এবিআরএসএম।

অন্যদিকে, এসএফআই বা অন্য বাম ছাত্র সংগঠনগুলির ঘোষিত রাজনৈতিক মিছিল না থাকলেও, রবিবার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে একটি ‘খোলা চিঠি’ দিয়েছে এসএফআই। গত শনিবার ভবানীপুরের এক সরকারি সভা থেকে শুভেন্দু অভিযোগ করেছিলেন যে, যাদবপুরে বন্দে মাতরম্‌ গাইতে দেওয়া হয় না, জাতীয় পতাকা ঘোরে না এবং সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাতে দেওয়া হয় না।

এই অভিযোগের তীব্র খণ্ডন করে এসএফআই চিঠিতে জানিয়েছে, বিরোধী দলনেতাকে ভুল তথ্য জোগানো হচ্ছে। সংগঠনের দাবি, ক্যাম্পাসে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল বলেই ১৯ আগস্ট রাতের বহিরাগতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বন্দে মাতরম্ ইস্যুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল ভাবনাকে উদ্ধৃত করে এসএফআই স্পষ্ট করে যে, উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ও বিদ্বেষ চর্চার সংস্কৃতিকে যাদবপুর প্রশ্রয় দেয় না।

ঐতিহ্যবাহী এমব্লেম ভাঙচুর ও পুনঃস্থাপন

গত বুধবার রাতে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে এবিভিপির সংঘর্ষের জেরে বৃহস্পতিবার সকালেও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। ওইদিন দুপুরে এবিভিপির পাতাকা হাতে একদল বহিরাগত বন্ধ গেট টপকে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে থাকা ঐতিহ্যবাহী বৃত্তাকার ধাতব এমব্লেমটি ভেঙে চূর্ণ করে ভেতরে ছুঁড়ে ফেলে বলে অভিযোগ। পরবর্তীতে শুক্রবার বিকেলে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য এবং রেজিস্টার উপস্থিত থেকে মেরামত করা ঐতিহ্যবাহী প্রতীকটি মূল ফটকে পুনঃস্থাপন করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.