নিউ মার্কেটের মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে মঙ্গলবার রাতের বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড ফের একবার কলকাতার অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার বেহাল দশাকে উস্কে দিল। কলকাতার বুকে গত দুই দশকে অন্তত আটটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। প্রতিবার অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনের তৎপরতা, তদন্ত কমিটি গঠন, নির্দেশিকা জারি কিংবা গ্রেপ্তারি হলেও সময় গড়াতেই আবার সেই একই গাফিলতির পুনরাবৃত্তি প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে জননিরাপত্তা নিয়ে।
বাম আমল থেকে তৃণমূল জমানা এবং বর্তমানে বিজেপির শাসনকাল— রাজ্যে রাজনীতির রঙ ও ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও মহানগরের অগ্নিকাণ্ডের চেনা ছবিতে কোনো বদল ঘটেনি। ‘ফায়ার এক্সিট’ বা জরুরি বেরোনোর দরজায় তালা ঝুল থাকা, বদ্ধ ঘরে ধোঁয়া আটকানো, কিংবা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে ভেতরে আটকে পড়া— একই রকমের বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে বারবার। কখনও বাণিজ্যিক আবাসন, কখনও হাসপাতাল, আবার কখনও হোটেলে দেখা গেছে এই বিপর্যয়।
কলকাতার বিগত দুই দশকের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের একটি পর্যালোচনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
- ২২ নভেম্বর, ২০০৬ (তপসিয়া চামড়া কারখানা): তপসিয়ার এক চামড়া কারখানায় কাজ করার সময় আগুন লাগে। কারখানার একমাত্র বেরোনোর দরজাটি তালাবন্ধ ছিল এবং আগুন লাগার পর চাবি খুঁজে পাওয়া যায়নি। শ্রমিকেরা দরজা ভেঙে বেরোনোর চেষ্টা করলেও ৯ জনের করুণ মৃত্যু হয় এবং ১৮ জন গুরুতর আহত হন।
- ২৩ মার্চ, ২০১০ (স্টিফেন কোর্ট, পার্ক স্ট্রিট): পার্ক স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী স্টিফেন কোর্টের অগ্নিকাণ্ড শহরের অন্যতম ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। আগুন ও ধোঁয়ায় বদ্ধ সিঁড়িতে আটকে পড়েছিলেন বহু মানুষ। কেউ বাঁচার তাগিদে উপর থেকে ঝাঁপ দেন, আবার কেউ ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা যান। ওই ঘটনায় মোট ৪৩ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং আহত হন কয়েকশো মানুষ।
- ৯ ডিসেম্বর, ২০১১ (আমরি হাসপাতাল, ঢাকুরিয়া): ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালের বেসমেন্টে জমা রাখা দাহ্য পদার্থ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিষাক্ত ধোঁয়া দ্রুত আইসিইউ সহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ায় চিকিৎসাধীন ও ঘুমন্ত রোগীরা আর বেরোতে পারেননি। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ৯৩ জন রোগী ও কর্মী মারা যান।
- ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ (সূর্য সেন স্ট্রিট, শিয়ালদহ): ভোররাতে শিয়ালদহের সূর্য সেন স্ট্রিটের কাগজ ও প্লাস্টিকের বাজারে আগুন লাগে। সেখানে ঘুমিয়ে থাকা বহু শ্রমিক অগ্নিকাণ্ডের পর বাজারের ভেতরেই আটকে পড়েন। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ও পুড়ে মারা যান ২০ জন শ্রমিক।
- ৯ মার্চ, ২০২১ (নিউ কয়লাঘাট বিল্ডিং, স্ট্র্যান্ড রোড): পূর্ব রেলের নিউ কয়লাঘাট বিল্ডিংয়ের বিষাক্ত ধোঁয়া ও আগুনে রেলের ডেপুটি চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার, চারজন দমকল কর্মী, একজন পুলিশ অফিসার এবং একজন আরপিএফ কর্মী সহ মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়।
- ২৯ এপ্রিল, ২০২৫ (মেছুয়াবাজার হোটেল): মেছুয়াবাজার এলাকার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুই শিশু সহ ১৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এবং আহত হন ১৩ জন। হোটেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও অগ্নি-সুরক্ষা বিধি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ওঠায় তদন্তে নামে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)।
- ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ (নাজিরাবাদ, আনন্দপুর): সাধারণতন্ত্র দিবসের ভোরে আনন্দপুরের নাজিরাবাদে একটি মোমো কারখানার গুদামে ভয়াবহ আগুন লাগে। পাশের গুদামেও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৭২ ঘণ্টার দীর্ঘ তল্লাশি অভিযানে অন্তত ১৮ জনের দেহাংশ উদ্ধার ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়। যদিও এই ঘটনায় মোট ২৭ জনের নামে নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়েছিল।
- ১৯ আগস্ট, ২০২৬ (মির্জ়া গালিব স্ট্রিট, নিউ মার্কেট): গভীর রাতে নিউ মার্কেট এলাকার একটি হোটেলে বিধ্বংসী আগুনে মৃত্যু হলো আবাসিকদের। হোটেলটিতে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না তা নিয়ে উঠেছে গভীর প্রশ্ন। ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী ও রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সার্বিক গাফিলতি ও সুরক্ষাবিধি লঙ্ঘনের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পূর্বতন তৃণমূল সরকারের প্রশাসনিক অবহেলাকে দায়ী করে মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী মন্তব্য করেন, “পূর্বতন সরকারের অভিশাপ আমাদের বহন করতে হচ্ছে।” মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, এই ঘটনার তদন্তে কোনো দোষীকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তদন্ত ও দোষারোপের রাজনীতির মাঝে সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন— বারবার তদন্ত কমিটি গঠন হলেও আদৌ কি পাল্টাবে কলকাতার এই ‘জতুগৃহ’ রূপ?

