নিউ মার্কেটের ‘শিখা ইন’ যেন এক জতুগৃহ: বিধি ভেঙে তৈরি ১১০০ বর্গফুটের মিনি-হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত ৯

নিউ মার্কেটের ‘শিখা ইন’ যেন এক জতুগৃহ: বিধি ভেঙে তৈরি ১১০০ বর্গফুটের মিনি-হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত ৯

কলকাতা শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল এলাকা নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত ‘শিখা ইন’ নামের হোটেলটি প্রকৃতপক্ষে এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছিল। মাত্র ১১০০ বর্গফুট আয়তনের অত্যন্ত সংকীর্ণ জায়গায় কোনো সুরক্ষা বিধির তোয়াক্কা না করে তৈরি করা হয়েছিল পাঁচটি পৃথক ঘর। মঙ্গলবার গভীর রাতে সেখানে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর বুধবার সকালে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে চরম অনিয়ম ও বেআইনি নির্মাণের চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ফল্‌স সিলিং ও দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে বিষাক্ত ধোঁয়ার তাণ্ডব

ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত ১:৩০ থেকে ২:০০ টার মধ্যে হোটেলের অভ্যর্থনা (রিসেবশন) কক্ষে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মাত্র কয়েক ফুটের ওই রিসেপশনে ছিল একটি টেবিল, একটি সোফা, দেওয়ালে বসানো টিভি এবং যাতায়াতের অতি সরু পথ।

তদন্তে দেখা গিয়েছে, পুরো হোটেলের পাঁচটি ঘরের জন্যই একটানা একটি মাত্র কাঠের তৈরি ফল্‌স সিলিং ব্যবহার করা হয়েছিল। ঘরগুলির বিভাজনকারী দেওয়ালগুলি মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল না; কেবল ফল্‌স সিলিং পর্যন্ত দেওয়াল তুলে ঘরগুলি আলাদা করা হয়। ফলে ফল্‌স সিলিংয়ের উপরের অংশ ফাঁকা অবস্থায় ছিল। এর পাশাপাশি, ঘরের আয়তন এতটাই অপ্রশস্ত ছিল যে স্বাভাবিক দরজা বসানোর সুযোগ না থাকায় লাগানো হয়েছিল ‘স্লাইডিং ডোর’।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রিসেপশনে আগুন লাগার পর বিষাক্ত ধোঁয়া কাঠের ফল্‌স সিলিংয়ের ফাঁকা অংশ, স্লাইডিং দরজার ফাঁক এবং সিলিংয়ে বসানো এলইডি লাইটের সকেটের ফাঁক দিয়ে দ্রুত প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। ঘরগুলিতে বিষাক্ত ধোঁয়া প্রবেশ বন্ধ করার কোনো পথ ছিল না।

জানলাহীন ঘরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ৮ আবাসিক ও ১ কর্মীর মৃত্যু

অগ্নিকাণ্ডের সময় ‘শিখা ইন’-এর পাঁচটি ঘরে মোট ১০ জন আবাসিক অবস্থান করছিলেন। এদের মধ্যে চারটিতে কোনো জানলা না থাকায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিষিয়ে ওঠে ঘরের ভেতরের বাতাস। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই আটজন আবাসিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ফরেন্সিক সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের কারও দেহ মিলেছে বিছানায়, কারও মেঝের ওপর, আবার কাউকে নিথর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে শৌচালয়ের ভেতর থেকে।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত হয়েছেন হোটেলের এক তরুণ কর্মীও। ঝাড়খণ্ডের গিরিডি থেকে জীবনের প্রথম চাকরি করতে কলকাতায় এসেছিলেন ওই যুবক। তিনি রিসেপশনের দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন।

অলৌকিক আত্মরক্ষা: জানলাযুক্ত ঘরের দম্পতি জীবিত

হোটেলের পাঁচটি ঘরের মধ্যে যে একটি মাত্র ঘরে জানলা ছিল, সেখানে অবস্থান করছিলেন এক দম্পতি। আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁরা কোনো মতে জানলা দিয়ে বেরিয়ে হোটেলের বাইরের সংকীর্ণ কার্নিসে আশ্রয় নেন। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে ওই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কার্নিসে দাঁড়িয়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বেলে নিচে থাকা লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন তাঁরা। পরবর্তীতে খবর পেয়ে দমকল কর্মীরা মইয়ের সাহায্যে ওই দম্পতিকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করেন।

একমাত্র বেরোনোর পথেই আগুন; তদন্তে গঠিত এসআইটি (SIT)

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসিকদের ঘর থেকে বেরিয়ে প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। কারণ পুরো হোটেলে প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য ছিল মাত্র একটিই দরজা, যা যুক্ত ছিল ওই রিসেপশন কক্ষটির সঙ্গে। ফলে বেরোনোর একমাত্র পথেই আগুন ও ধোঁয়া সৃষ্টি হওয়ায় পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে যায়।

ঘটনার তদন্তে ফরেন্সিক আধিকারিকেরা দুর্ঘটনাস্থল থেকে পোড়া তারের অংশ, ক্ষতিগ্রস্ত টিভি-সহ বেশ কিছু নমুনা সংগ্রহ করেছেন।

এদিকে, এই ভয়াবহ ঘটনার পর কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (DC)-এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করেছেন এবং রিপোর্ট পাওয়ার পর আইন মেনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের পর দমকল বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দুটি ভবন সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.