নিম্নচাপের টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলা, বিপর্যস্ত জনজীবন

নিম্নচাপের টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলা, বিপর্যস্ত জনজীবন

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের জেরে গত দু’দিনের টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত দক্ষিণবঙ্গের সিংহভাগ এলাকা। একাধিক নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পেয়ে সৃষ্টি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতির। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি পর্যবেক্ষণ করতে সরেজমিনে পৌঁছেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্যরা। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একাধিক সরকারি সহায়তার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

পূর্ব মেদিনীপুরে ভয়াবহ বিপর্যয়

টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে হলদিয়া পুরসভা, পটাশপুর, এগরা ও তমলুকের বিস্তীর্ণ এলাকা। কেলেঘাই নদীর বাঁধ ভেঙে পটাশপুরে তৈরি হয়েছে মারাত্মক বন্যা পরিস্থিতি। কেলেঘাই নদীর জল কিছুটা কমলেও তা এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। বাঁধের ফাটল মেরামতে সেচ দফতর মাটির বস্তা ব্যবহার করছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পটাশপুর ও হলদিয়ায় এনডিআরএফ (NDRF)-এর দুই ও পটাশপুরে এসডিআরএফ (SDRF)-এর একটি দল মোতায়েন করা হয়েছে। ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৪০০ জন অসামরিক প্রতিরক্ষা কর্মী। দুর্গতদের মধ্যে ইতিমধ্যে ৪৫,০০০ ত্রিপল বিতরণ করা হয়েছে এবং ২৭টি লঙ্গরখানার মাধ্যমে খাবার ও পানীয় জল সরবরাহ করা হচ্ছে।

হালহকিকত খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবার হলদিয়ার জলমগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ ছাড়া জলমগ্ন এলাকাগুলি পরিদর্শন করেন সেচমন্ত্রী অরূপকুমার দাস এবং পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।

মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠক ও ক্ষতিপূরণ ঘোষণা

মঙ্গলবার হলদিয়া ভবনে জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার, পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠক শেষে তিনি জানান:

  • ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সমীক্ষার জন্য কৃষি, উদ্যানপালন, মৎস্য, বিপর্যয় মোকাবিলা ও সেচ দফতরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হবে।
  • যাঁদের মাটির বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে পড়েছে, তাঁদের ২০,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
  • বর্তমানে ত্রাণশিবিরে থাকা ১৫,০০০ মানুষকে বাড়ি ফেরার সময় অতিরিক্ত ৫ দিনের খাদ্যসামগ্রী প্রদান করা হবে।

হাসপাতালে জল, ব্যাহত পরিষেবা

হাওড়ায় বৃষ্টির প্রকোপ কমলেও বেলাগাম জলজটে বেলুর ইএসআই (ESI) হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ একাধিক ওয়ার্ড প্লাবিত। ফলে এক্স-রে, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি ও ছোট অস্ত্রোপচার আপাতত বন্ধ রয়েছে। পাম্প চালিয়ে জল নিষ্কাশনের চেষ্টা চলছে বলে জানান সহকারী সুপার জয়দীপ পাল। অন্যদিকে, শিবপুরের প্লাবিত অঞ্চলগুলিতে নিকাশি ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে চালানো হচ্ছে অতিরিক্ত পাম্প।

পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় প্রাণহানি ও যাতায়াত বিচ্ছিন্ন

  • পশ্চিম বর্ধমান: আসানসোল উত্তর বিধানসভার রেলপাড়, রামকৃষ্ণডাঙা, বেলডাঙাসহ একাধিক এলাকা গাড়ুই ও নুনিয়া নদীর জলে প্লাবিত। সোমবার থেকে বিদ্যুৎহীন পুরো এলাকা। অন্যদিকে, সালানপুরের জহরগড় সেতুতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আমির গেয়াস (১৮) নামের এক যুবকের নদীতে তলিয়ে মৃত্যু হয়েছে।
  • বাঁকুড়া: গন্ধেশ্বরী, দ্বারকেশ্বর, শিলাবতী ও কংসাবতী নদীর জলস্তর হু-হু করে বাড়ছে। কেঞ্জাকুড়ার সঞ্জীবনী সেতু ও মীনাপুর সেতু জলের তলায় চলে যাওয়ায় যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ। গন্ধেশ্বরী নদীর তোড়ে আটকে পড়ে একটি ডাম্পার। পরিস্থিতি সামাল দিতে মুকুটমণিপুর জলাধার থেকে ৫,০০০ কিউসেক জল ছাড়া শুরু হয়েছে।
  • পুরুলিয়া: সাঁতুড়ির সুভাষ রোডের একটি প্লাবিত সেতু পার হওয়ার সময় এক ব্যক্তি বাইকসহ ভেসে গেলে স্থানীয়রা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করেন।

দক্ষিণবঙ্গের পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য প্রশাসনের সব ক’টি বিভাগকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.