মানকুণ্ডুর ‘আনন্দ আশ্রম’ মানসিক হাসপাতালে একাধিক আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ: তদন্তে গঠন করা হলো ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি

মানকুণ্ডুর ‘আনন্দ আশ্রম’ মানসিক হাসপাতালে একাধিক আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ: তদন্তে গঠন করা হলো ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি

হুগলি জেলার ঐতিহাসিক মানকুণ্ডু মানসিক হাসপাতাল (বর্তমানে ‘আনন্দ আশ্রম’ নামে পরিচিত)—এর বিরুদ্ধে ভূরি ভূরি বেনিয়ম, বেআইনি নির্মাণ ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। হাসপাতালের প্রশাসনিক অচলাবস্থা দূরীকরণ এবং উত্থাপিত অভিযোগসমূহের নিরপেক্ষ তদন্তে চন্দননগর মহকুমা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ (Fact-Finding Committee) গঠন করা হয়েছে।

ইতিহাস ও বর্তমান পরিকাঠামো

হাওড়া-ব্যান্ডেল মেন লাইনে ভদ্রেশ্বর পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের খাঁ রোড এলাকায় ১৯৩৯ সালে প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর বিশিষ্ট চিকিৎসক হরনাথ বসু মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাধীনতার পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রটি একসময় অর্থাভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রমে পৌঁছায় এবং কেবল আউটডোর পরিষেবা চালু থাকে।

পরবর্তীকালে সরকারি আর্থিক সহায়তায় সংস্কারের পর ৬০ শয্যাবিশিষ্ট তিনতলা নতুন ভবন গড়ে তোলা হয়। ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত এই হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্ব ২০১১ সালে ভদ্রেশ্বর পুরসভা গ্রহণ করে।

যেসব গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ

সম্প্রতি হাসপাতালে যেসব প্রশাসনিক ও পরিকাঠামোগত দুর্নীতির তথ্য সামনে এসেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • দোকানঘর বিক্রিতে প্রতারণা: হাসপাতালের জমি ব্যবহার করে শতাধিক দোকানঘর তৈরি করে বিক্রির নামে ৮০ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হলেও দীর্ঘ দিন ধরে ব্যবসায়ীদের তা হস্তান্তর করা হয়নি।
  • সম্পদ ও পরিকাঠামোগত দুর্নীতি: হাসপাতালের পুকুর, গাছগাছালি, সাইকেল স্ট্যান্ড পরিচালনা ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
  • পরিকাঠামোর অভাব: চিকিৎসার সুবিধাযুক্ত হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও এখানে নিরাপদ পানীয় জল, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যাকআপ এবং নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার ব্যবস্থা নেই।
  • বেতন বাকি ও দ্বৈত পদ: পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়ার কারণে বিগত তিন মাস ধরে এখানকার স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন বকেয়া রয়েছে। একই সঙ্গে পুরসভা ও মানসিক হাসপাতালে বেআইনিভাবে দ্বৈত চাকরি করার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে।

প্রশাসন ও বিধায়কের সরেজমিন পরিদর্শন

উদ্ভূত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি চন্দননগর বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ এবং ভদ্রেশ্বর পুরসভার প্রশাসক তথা চন্দননগরের মহকুমা শাসক (SDO) আশুতোষ কুমার যৌথভাবে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শন শেষে বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ জানান:

“দেশের অন্যতম প্রাচীন এই মানসিক হাসপাতালে ন্যূনতম পানীয় জলের পরিকাঠামো নেই। ২০২২ সালের পর থেকে হাসপাতালে হওয়া সমস্ত নিয়োগ এবং আয়-ব্যয়ের হিসাবের অডিট করা হবে। বেআইনি নিয়োগ, সিসিটিভি স্থাপন ও পানীয় জলের দ্রুত সুব্যবস্থা করা হচ্ছে। লাইসেন্স যাতে বাতিল না হয়, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

প্রশাসনিক পরিকাঠামো পুনর্গঠনের আশ্বাস দিয়ে চন্দননগর মহকুমা শাসক আশুতোষ কুমার বলেন:

“রোগীদের চিকিৎসা, ওষুধ কিংবা খাবারে কোনো আপস করা হবে না। অবৈধ নির্মাণ ও অন্যান্য অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটি পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ ও পরিচালন ব্যবস্থা সুনির্দিষ্ট করবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.