গোয়ার পাঁচতারা হোটেলের ঘটনায় ২০১৩ সালের মামলায় সাজা ঘোষণা: তহেলকার প্রতিষ্ঠাতা তরুণ তেজপালকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিল বম্বে হাইকোর্ট

গোয়ার পাঁচতারা হোটেলের ঘটনায় ২০১৩ সালের মামলায় সাজা ঘোষণা: তহেলকার প্রতিষ্ঠাতা তরুণ তেজপালকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিল বম্বে হাইকোর্ট

গোয়ার পাঁচতারা হোটেলের ঘটনায় ২০১৩ সালের মামলায় সাজা ঘোষণা: তহেলকার প্রতিষ্ঠাতা তরুণ তেজপালকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিল বম্বে হাইকোর্ট

বিশেষ সংবাদ বিভাগ

তেরো বছর আগের বহুল আলোচিত যৌন নির্যাতন মামলায় সংবাদমাধ্যম ‘তহেলকা’র প্রতিষ্ঠাতা তরুণ তেজপালকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে বম্বে হাইকোর্ট। পাশাপাশি বিভিন্ন ধারায় তাঁকে মোট ১০ লক্ষ ২১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গোয়ার একটি নিম্ন আদালতের খালাসের রায় খারিজ করে বৃহস্পতিবার বিচারপতি নীলা গোখেল এবং বিচারপতি অমিত জামসান্দেকরের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেয়। আত্মসমর্পণ করার জন্য তেজপালকে দুই সপ্তাহের সময়সীমা দিয়েছে আদালত।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই

২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে গোয়ার একটি পাঁচতারা হোটেলে তহেলকা আয়োজিত অনুষ্ঠান চলাকালীন লিফটে কর্মরত এক সহকর্মী তরুণীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে তরুণ তেজপালের বিরুদ্ধে। গোয়া পুলিশ তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানায়, ৭ ও ৮ নভেম্বর টানা দুই দিন ওই তরুণীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল।

এক নজরে মামলার ঘটনাক্রম:

  • ২০১৩ (৩০ নভেম্বর): গোয়া পুলিশ তরুণ তেজপালকে গ্রেফতার করে। তিনি ছ’মাস ভাসকোর জেলে বন্দি ছিলেন।
  • ২০১৪: গোয়া পুলিশের অপরাধ দমন শাখা প্রায় ৩,০০০ পৃষ্ঠার চার্জশিট পেশ করে। ওই বছরের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পান তেজপাল।
  • ২০১৭-২০১৯: নিম্ন আদালত মামলাটি বিচার্য বলে মানলে তেজপাল এফআইআর বাতিলের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে যান। শীর্ষ আদালত তাঁর আর্জি খারিজ করে মামলাটি নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠায়।
  • ২০২১: গোয়ার দায়রা (সেশনস) আদালত তেজপালকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত করে নির্দোষ ঘোষণা করে।
  • হাইকোর্টে আপিল: দায়রা আদালতের খালাসের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় গোয়া রাজ্য সরকার।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিতর্ক

মামলায় রাজ্য সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা যুক্তি দেন যে, দায়রা আদালত একজন যৌন নির্যাতিতার আচার-আচরণ সম্পর্কে পূর্বধারণার ওপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছিল। দায়রা আদালতের বিচারক তাঁর রায়ে বলেছিলেন, ঘটনার পর অভিযোগকারিণী স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ করেছিলেন। এর জবাবে মেহতা বলেন, নির্যাতিতার প্রতিক্রিয়া তাঁর ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে; এর কোনও সাধারণীকরণ করা যায় না।

বম্বে হাইকোর্ট সলিসিটর জেনারেলের যুক্তির সঙ্গে একমত হয়ে জানায়, নিম্ন আদালত নির্যাতিতার শারীরিক ও মানসিক আচরণের ক্ষেত্রে গতেবাঁধা ধারণার বশবর্তী হয়েছিল। সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন হলেও, তেজপালের পূর্বে অপরাধের কোনও নজির না থাকায় আইনানুযায়ী সর্বনিম্ন ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।

নতুন ধর্ষণ আইন ও মামলার গুরুত্ব

২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ডের পর বিচারপতি জে. এস. বর্মা কমিটির সুপারিশে ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৫ নম্বর ধারায় পরিবর্তন এনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় আমূল সংশোধন করা হয়। পূর্বে কেবল সম্মতি ছাড়া যৌনক্রিয়াকেই ধর্ষণ ধরা হতো; কিন্তু নতুন আইনে স্পষ্ট করা হয়, নারীর সম্মতি ছাড়া শরীরে যেকোনো ধরনের যৌন নির্যাতন বা বস্তুর অনুপ্রবেশ ঘটানোই আইনের চোখে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। ২০২৪ সালে চালু হওয়া ভারতীয় ন্যায় সংহিতাতেও এই সংজ্ঞা অপরিবর্তিত রয়েছে।

নির্যাতিতা তরুণী জানিয়েছেন, প্রাথমিক ধাক্কা সামলে তিনি বুঝতে পারেন নতুন আইন অনুযায়ী তাঁর ওপর যা ঘটেছে তা আইনি পরিভাষায় ‘ধর্ষণ’।

তেজপালের প্রতিক্রিয়া

আদালতের অনুমতি নিয়ে ৬২ বছর বয়সি তরুণ তেজপাল দাবি করেন, তিনি ‘রাজনীতির শিকার’ এবং তৎকালীন রাজ্য সরকারের সমালোচনা করার প্রতিশোধ হিসেবেই এই মামলা আনা হয়েছে। নিজের পরিবার ও দুই কন্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে সত্য প্রকাশের চেষ্টা করেও তা ব্যর্থ হয়েছে। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.