অভিযুক্ত হলেও নাগরিকের ১০ বছরের মেয়াদের পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে: কলকাতা হাই কোর্ট

অভিযুক্ত হলেও নাগরিকের ১০ বছরের মেয়াদের পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে: কলকাতা হাই কোর্ট

কোনও ব্যক্তি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলেই তাঁকে স্বাভাবিক মেয়াদের পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট। পাসপোর্ট রাখা এবং বিদেশ ভ্রমণ— এই দুটিকে পৃথক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের এক বছরের মেয়াদের পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছেন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও।

বুধবার মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও নির্দেশ দেন, আবেদনকারীর পাসপোর্ট আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ১০ বছরের মেয়াদের জন্য নবীকরণ (রিনিউ) করে দিতে হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, “পাসপোর্ট অন্যান্য সরকারি নথির মতোই একটি নাগরিক পরিচয়পত্র। কেউ পাসপোর্ট তৈরি করছেন মানেই তিনি বিদেশে যাবেন, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। পাসপোর্ট নিজের কাছে রাখা এবং বিদেশ ভ্রমণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।”

মামলাটির সূত্রপাত অমিতকুমার আগরওয়াল নামে এক ব্যক্তির আবেদনকে কেন্দ্র করে। তাঁর বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ডের রাঁচীর একটি বিশেষ আদালতে প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (পিএমএলএ)-এর অধীনে দু’টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি তা নবীকরণের জন্য বিশেষ আদালতের অনুমতি চান। বিশেষ আদালত শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দিয়ে জানায়, আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন না এবং নবীকরণের পাঁচ দিনের মধ্যে পাসপোর্টটি আদালতে জমা দিতে হবে।

তবে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, আদালত নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদের কথা উল্লেখ না করায় ১৯৯৩ সালের একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ এক বছরের মেয়াদের পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব। এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন অমিতকুমার। তাঁর যুক্তি ছিল, প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ক্ষেত্রে পাসপোর্টের স্বাভাবিক মেয়াদ ১০ বছর, তাই এক বছরের মেয়াদ নির্ধারণ আইনসম্মত নয়।

মামলায় কেন্দ্র তথা বিদেশ মন্ত্রকের যুক্তি ছিল যে তারা বিদ্যমান আইন ও নির্দেশিকা মেনেই এক বছরের পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে এই যুক্তি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় উচ্চ আদালত।

বিচারপতি রাও প্রশ্ন তোলেন, অভিযুক্ত বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন— কেবল এই আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে কি পাসপোর্টের মেয়াদ কমিয়ে এক বছর করা হয়েছে? আদালত স্পষ্ট করে জানায়, আইনকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয় যা নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে সংকুচিত করে কিংবা আদালতের ওপর অপ্রয়োজনীয় মামলার বোঝা চাপায়। বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া বিচারবিভাগের এক্তিয়ারভুক্ত, কিন্তু পাসপোর্টের নিয়মিত মেয়াদ নির্ধারণ করা প্রশাসনিক দায়িত্ব। ১০ বছরের জন্য পাসপোর্ট নবীকরণ করা হলে তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না, বরং প্রতি বছর মেয়াদ বাড়াতে আদালতে আসার হয়রানি এড়ানো সম্ভব হবে।

হাই কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, তিন সপ্তাহের মধ্যে ১০ বছরের জন্য পাসপোর্ট নবীকরণ করে দিতে হলেও বিদেশ ভ্রমণের আগে আবেদনকারীকে রাঁচীর বিশেষ আদালতের আগাম অনুমতি নিতে হবে এবং আরোপিত শর্তাবলী কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.