তারকেশ্বরের ঐতিহাসিক শ্রাবণী মেলার উদ্বোধনে গিয়ে পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তারকেশ্বর এতদিন ‘অবহেলিত’ ছিল দাবি করে তিনি এর জন্য আগের সরকারের ‘একচোখো নীতি’ ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতিকে দায়ী করেন। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বর্তমান সরকারের উদ্যোগে এবার থেকে তারকেশ্বর ধামকে আন্তর্জাতিক তীর্থক্ষেত্রে পরিণত করা হবে এবং শ্রাবণী মেলা পাবে জাতীয় মেলার তকমা।
উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী এ রাজ্যে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ ‘তীর্থক্ষেত্র সার্কিট’ তৈরির পরিকল্পনার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
জলযাত্রীদের জন্য নজিরবিহীন সরকারি ব্যবস্থা
বিগত বছরগুলিতে রাজ্য সরকারের তরফে পুণ্যার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হতো না বলে অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আগে বিজেপি নিজস্ব উদ্যোগে সেবা দিলেও, এবার থেকে রাজ্য সরকার সরাসরি জলযাত্রীদের জন্য বিশেষ ও নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
এ বছর পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ:
- সরকারি সেবাকেন্দ্র: শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত যাত্রাপথে প্রতি ৫ কিলোমিটার অন্তর অন্তর সরকারি সেবাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে পুণ্যার্থীদের জন্য পানীয় জল, ওআরএস (ORS) এবং সব ধরনের সহযোগিতার ব্যবস্থা থাকবে।
- আলোকসজ্জা: পুণ্যার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে পুরো পথ যতটা সম্ভব আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে।
- আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি: আবহাওয়া অনুকূল থাকলে, শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার জলযাত্রীদের ওপর আকাশ থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পুষ্পবৃষ্টি করা হবে।
- প্রশাসনিক তৎপরতা: আগের সরকারের মতো কেবল গোটাকতক সিভিক ভলান্টিয়ার দাঁড় করিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করার সনাতনী অভ্যাসের সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এবার তারকেশ্বর ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (TDA) দায়িত্ব সরাসরি একজন অতিরিক্ত জেলাশাসককে (ADM) দেওয়া হয়েছে।
শুধু তারকেশ্বরই নয়, জলপাইগুড়ির জল্পেশ মন্দির এবং ভুটান সীমান্তের শিবমন্দিরেও জলযাত্রীদের জন্য অনুরূপ বিশেষ ব্যবস্থা থাকছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান।
“সরকার চলবে প্রধানমন্ত্রী মোদীর দেখানো পথে”
পূর্বতন সরকারের আধ্যাত্মিক বিমুখতার সমালোচনা করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘আজ রাজা বা জমিদার প্রথা উঠে গিয়েছে। লোকধর্ম পালন করতে গেলে কোনও সরকারের একটা চোখ বন্ধ রাখা উচিত নয়, দুটো চোখই খোলা রাখা উচিত। প্রত্যেক নির্বাচিত সরকারের কর্তব্য আধ্যাত্মিকতা ধরে রাখা। বিগত সরকার এক চোখ বন্ধ করে রাখত।’’
তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, পশ্চিমবঙ্গে গঠিত নতুন সরকার পূর্বতন সরকারের পথে হাঁটবে না। এই সরকার রাষ্ট্রবাদ, দেশপ্রেম এবং ভারতের সনাতন সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিয়ে রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দেখানো পথেই পরিচালিত হবে।
কাশী-অযোধ্যার তর্জেই সাজবে তারকেশ্বর, তৈরি হচ্ছে ১০০০ কোটির সার্কিট
তারকেশ্বরের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উজ্জয়িনী, কাশী বিশ্বনাথ কিংবা অযোধ্যার রামমন্দিরকে যে স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ঠিক সেইভাবেই তারকেশ্বরকেও সাজিয়ে তোলা হবে। এর ফলে শুধু স্থানীয়দেরই উন্নয়ন হবে না, বরং মন্দিরের প্রাচীন ঐতিহ্য ও গরিমা বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাবে।
এর পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় পর্যটন ও হেরিটেজ সংরক্ষণের জন্য তাঁর সরকার ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রকল্পের আওতায় মুর্শিদাবাদের কিরীটেশ্বরী, জলপাইগুড়ির জল্পেশ, কোচবিহারের মদনমোহন, বীরভূমের তারাপীঠ, দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট এবং তারকেশ্বরকে যুক্ত করে একটি সুসংহত ‘তীর্থক্ষেত্র সার্কিট’ গড়ে তোলা হবে। প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মঠ-মন্দিরগুলির সংস্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণে এই অর্থ ব্যয় করা হবে বলে নবান্নের বৈঠকের পর তারকেশ্বরের মঞ্চ থেকেও নিশ্চিত করেন মুখ্যমন্ত্রী।

