দুই দশক পর ফের পশ্চিমবঙ্গে ফিরছেন প্রখ্যাত ও বিতর্কিত বাংলাদেশি সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ আগস্ট (শনিবার) কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দেবেন। একাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি এই অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী এই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে রাজি হয়েছেন।
“আইনি বাধা নেই, প্রশাসন নিশ্চিত করেছে নিরাপত্তা”
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা মোহিত রায় সংবাদমাধ্যমকে জানান, তসলিমা নাসরিনের রাজ্যে আসার ক্ষেত্রে কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই। বিগত বাম ও তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আদতে বিগত দু’টো সরকার মৌলবাদের কাছে নতজানু হয়েছিল। এখন রাজ্যে নতুন সরকার এসেছে। এই নতুন আবহে আমরা যারা দীর্ঘ দিন তসলিমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি, তারা সিদ্ধান্ত নিই যে এবার তাকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হবে।”
মোহিত রায় আরও স্পষ্ট করে দেন যে, এই আয়োজনের নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। অনুষ্ঠানটি মূলত তসলিমা নাসরিনের কবিতা ও গানকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। তবে লেখিকার নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায়, সরকারের পক্ষ থেকে তার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, আয়োজক সংগঠনগুলির অন্যতম ‘সেক্যুলার মিশন’-এর পক্ষে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ওসমান মল্লিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, “দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান…। সকল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে পরাস্ত করে তিনি আসছেন। আমরা তাঁর সংগ্রামের সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।” উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে তসলিমা নাসরিনকে ‘মৌলবাদ বিরোধী প্রতিবাদের অগ্নিসম প্রতীক’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া
তসলিমা নাসরিনের এই কলকাতা সফরকে কেন্দ্র করে ইতিমিধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে বিতর্ক ও তরজা। ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF) নেতা তথা ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি বর্তমান বিজেপি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
সরকারকে নিশানা করে নওশাদ সিদ্দিকি বলেন, “ক্ষমতায় এলে বিনামূল্যে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ এবং সবাইকে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি ইস্তাহারে দেওয়া হয়েছিল, তা এই বিজেপি সরকার রাখতে পারেনি। তাদের কাছে মুসলমানদের টাইট করাটাই যেন উন্নয়ন।” তসলিমা নাসরিনকে ‘মুসলমান-বিদ্বেষী’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরও যোগ করেন, “তসলিমা নাসরিনকে আনার মাধ্যমে বিজেপি সমর্থকদের মনে হবে যে মুসলমানদের টাইট করা হবে। তারা এটাকেই উন্নয়ন ভাবছে।”
২০০৭-এর স্মৃতি ও প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে তসলিমা নাসরিনের ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসকে কেন্দ্র করে কলকাতায় তীব্র আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। কলকাতার বেশ কিছু সংখ্যালঘু প্রধান এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎকালীন প্রশাসনকে সেনা পর্যন্ত মোতায়েন করতে হয়েছিল।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার বিতর্কিত বইটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং লেখিকাকে কলকাতা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে তৃণমূল সরকারের আমলেও তসলিমা নাসরিনের রাজ্যে প্রবেশের ওপর সেই অলিখিত ‘নিষেধাজ্ঞা’ বহাল ছিল। অবশেষে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, দীর্ঘ ২০ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে পুনরায় কলকাতায় পা রাখতে চলেছেন এই সাহিত্যিক।

