মঙ্গলবার দুপুর থেকে কলকাতা সহ দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশে আছড়ে পড়ল তীব্র কালবৈশাখী ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাত। তবে এই দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা গেল বজ্রপাতে। রাজ্য জুড়ে বজ্রাঘাতের জেরে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ঝড়ের দাপটে কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় গাছ উপড়ে পড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে চূড়ান্ত ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ ও নিত্যযাত্রীরা।
জেলায় জেলায় বজ্রপাতে প্রাণহানি
হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস মিলিয়ে মঙ্গলবার দুপুর থেকেই আকাশ কালো করে ধেয়ে আসে ঝড়-বৃষ্টি। তবে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই বিভিন্ন জেলায় দফায় দফায় তীব্র বজ্রপাত শুরু হয়। আবহাওয়া দপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মুর্শিদাবাদ, কোচবিহার, মালদহ এবং পুরুলিয়া জেলায়।
- মুর্শিদাবাদ ও মালদহ: মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান গঙ্গাঘাট থেকে ২৫-৩০ জন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা মালদহের পারলালপুর ঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। নৌকাটি ঘাটে পৌঁছানো মাত্রই হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ঘাটে নামার পরেই আকস্মিক বজ্রাঘাতে বহু যাত্রী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই চার জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। আহত যাত্রীদের উদ্ধার করে প্রথমে মালদহের হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে অধিকাংশকে শমসেরগঞ্জের অনুপনগর ব্লক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে, মালদহের বৈষ্ণবনগর এলাকায় পাট ক্ষেতে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে আরও দুই কৃষকের মৃত্যু হয়েছে।
- কোচবিহার: কোচবিহারের মাথাভাঙা শীতলকুচি ব্লকের সাটিমারি এলাকায় বৃষ্টির মধ্যে মাঠ থেকে গবাদি পশু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে ঝলসে যান মেনকা বর্মণ (৫৯) নামে এক গৃহবধূ। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এছাড়া কোচবিহারেরই সুটকাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের ময়নাগুড়ি এলাকায় চাষের জমিতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে আরমান হোসেন (২০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়।
- পুরুলিয়া: পুরুলিয়া জেলায় বজ্রপাতে মোট আট জন গুরুতর আহত হন, যাদের মধ্যে জয়পুর থানা এলাকার ছয় জন এবং বরাবাজার থানা এলাকার দুই জন বাসিন্দা রয়েছেন। তাঁদের পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই জনের মৃত্যু হয়। বাকি ছয় জনের চিকিৎসা চলছে।
কলকাতায় ঝড়ের তাণ্ডব ও জনজীবন বিপর্যস্ত
মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক ২টো নাগাদ কলকাতার আকাশ অন্ধকার করে প্রবল বেগে ঝড় ও মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির পাশাপাশি মুহুর্মুহু বজ্রপাতে কেঁপে ওঠে মহানগরী। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের কমলা সতর্কতা জারি থাকা অবস্থায় ঝড়ের গতিবেগ এতটাই বেশি ছিল যে শহরের একাধিক অঞ্চলের জনজীবন স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
কলকার ধর্মতলা, মৌলালি, এবং হাই কোর্ট চত্বর সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিশালাকার গাছ উপড়ে পড়ে। কলকাতা হাই কোর্টের পার্কিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকটি গাড়ির উপর গাছ ভেঙে পড়ায় গাড়িগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডাফরিন রোডে একটি অস্থায়ী মূর্তি ভেঙে পড়ে। এছাড়া শহরের বহু জায়গায় বিদ্যুতের তারের উপর গাছ পড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মৌলালিতে একটি গাড়ির উপর তার ছিঁড়ে পড়লে চাঞ্চল্য ছড়ায়। রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই লেনের রাস্তার এক দিক দিয়ে কোনোমতে যানবাহন চলাচল সচল রাখা হয়, যার ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। স্কুল-কলেজ ছুটির সময়ে এই দুর্যোগ নামায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা চরম বিপাকে পড়েন। খবর পেয়ে কলকাতা পুরসভার কর্মীরা দ্রুত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় গাছ কেটে রাস্তা পরিষ্কারের কাজে হাত দেন। হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও সমান্তরালভাবে ঝেঁপে বৃষ্টি নেমেছিল।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস ও সতর্কতা
আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর আগেই মঙ্গলবার দুপুর ২টো থেকে পরবর্তী তিন ঘণ্টার জন্য কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলি এবং নদিয়ার কিছু অংশে কমলা সতর্কতা (Orange Alert) জারি করেছিল। কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে তীব্র বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়া জেলাতেও দিনভর ঝোড়ো হাওয়া ও মাঝারি বৃষ্টির জন্য কমলা সতর্কতা বহাল ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে মৎস্যজীবীদের আগামী দুই দিন সমুদ্রে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রশাসন।

