দলের ভাঙন ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে এবার আইনি ও আর্থিক টানাপোড়েনের মুখে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেস। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক তৃণমূল বিধায়কের দায়ের করা এফআইআর-এর (FIR) ভিত্তিতে দলীয় তহবিলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সমস্ত ধরনের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বিধাননগর পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে ওই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে টাকা তোলা বা স্থানান্তর করা যাবে না বলে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
৪৪০ কোটি টাকা অবরুদ্ধ
পুলিশ সূত্রে খবর, যে তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলিতে মোট ৪৪০ কোটি টাকা রয়েছে। এর মধ্যে:
- সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (AITC) মূল অ্যাকাউন্টে রয়েছে ২৬০ কোটি টাকা।
- দলের ত্রিপুরা এবং গোয়া শাখার নামে থাকা অপর দুটি অ্যাকাউন্টে রয়েছে মোট ১৮০ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনে তৃণমূলের জমা দেওয়া অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী তাদের মোট তহবিলের পরিমাণ ৬৭৫ কোটি টাকা। তার একটি বড় অংশই এখন পুলিশের নির্দেশে অবরুদ্ধ।
নেপথ্যে অরূপ বিশ্বাসের চিঠি ও বিধায়কের এফআইআর
গত ৫ জুন দলের সাংগঠনিক রদবদলে কোষাধ্যক্ষ পদ থেকে অরূপ বিশ্বাসকে সরিয়ে রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী এখনও শুভাশিস চক্রবর্তী ‘সিগনেটরি’ বা আর্থিক লেনদেনের আইনি সই করার অধিকার পাননি। ফলে ব্যাঙ্কের খাতায় এখনও অরূপ বিশ্বাসই কোষাধ্যক্ষ। দলীয় ভাঙনের আবহে কোনো আইনি জটিলতায় যাতে জড়াতে না হয়, সেই কারণে অরূপ বিশ্বাস নিজেই ওই বেসরকারি ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে লেনদেন বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন, যা বৃহস্পতিবার প্রকাশ্যে আসে।
এরই সমান্তরালে, বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক বিধায়ক বিধাননগর পুলিশের সাইবার থানায় অভিযোগ করেন যে, পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেআইনিভাবে অর্জিত অর্থ ওই তিনটি অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হয়েছে। অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে হওয়া এই লেনদেনের তথ্যপ্রমাণ যাতে নষ্ট না হয়, তার জন্য দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানান তিনি। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ এফআইআর রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে।
অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত: কুণাল ঘোষের তোপ
রাজনৈতিক মহলের অভিযোগ, এই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চাইছে বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির। তারা এই বিষয়ে পুলিশের দ্বারস্থও হয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-পন্থী বিধায়ক কুণাল ঘোষ। সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’ (পূর্বতন টুইটার)-এ পোস্ট করে তিনি বিদ্রোহীদের নিশানা করে কয়েকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলেন:
“তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট থেকে এবারের ভোটে প্রার্থী হিসেবে আপনাদের টাকা দেওয়া হয়েছিল কি না? যদি সেই অ্যাকাউন্ট নিয়ে আপনাদের অভিযোগই থাকে, তাহলে টাকা নিলেন কেন এবং নিজের ভোটে কাজে লাগালেন কেন? যদি এখন নীতিগত আপত্তি থাকে, তাহলে সেই টাকা আগে ফেরত না দিয়ে অ্যাকাউন্ট নিয়ে অভিযোগ করলেন কেন?” — কুণাল ঘোষ
কুণাল ঘোষ আরও দাবি করেন, যদি ওই অ্যাকাউন্টের টাকা বেআইনি হয়ে থাকে, তবে সেই টাকায় যারা নির্বাচন লড়েছেন, তাদের সকলের ভোটও অবৈধ ঘোষণা করা উচিত।
ঋতব্রত ও মমতা শিবিরের এই প্রকাশ্য আর্থিক ও আইনি লড়াইয়ে তৃণমূলের অন্দরের ফাটল এখন আরও চওড়া হলো বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

