পুলিশ সুরক্ষিত থাকলে তবেই সুরক্ষিত থাকবে জনতা: বাহিনীতে সংস্কার ও বড় নিয়োগের বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

পুলিশ সুরক্ষিত থাকলে তবেই সুরক্ষিত থাকবে জনতা: বাহিনীতে সংস্কার ও বড় নিয়োগের বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

রাজ্যে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশ বাহিনীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বড়সড় নীতিগত পরিবর্তনের বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার এক প্রশাসনিক কর্মসূচি থেকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নতুন সরকারের জমানায় কর্তব্যরত অবস্থায় আক্রান্ত হয়ে কোনো পুলিশকর্মীকে আর হাসপাতালে যেতে হবে না; পুলিশকর্মীদের গা থেকে রক্ত বেরোতে দেবে না তাঁর সরকার। একই সঙ্গে রাজ্য পুলিশকে স্বনির্ভর করে তুলতে এবং পরিকাঠামো উন্নয়নে একগুচ্ছ পদক্ষেপের পাশাপাশি বাহিনীতে বড়সড় নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় রক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঐতিহাসিক ‘মউ’ স্বাক্ষর

রাজ্য পুলিশের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং পরিকাঠামোগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বুধবার এক তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ করেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্থ মর্যাদাপূর্ণ ‘রাষ্ট্রীয় রক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়’-এর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক বা ‘মউ’ (MoU) স্বাক্ষর করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। এই মউ স্বাক্ষর কর্মসূচি থেকেই রাজ্যের পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে তোলার এক রূপরেখা পেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী।

কলকাতা পুলিশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,

“পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের দক্ষতা এক সময় অনেক ভালো জায়গায় ছিল, অনন্য উচ্চতায় ছিল। কলকাতা পুলিশকে আন্তর্জাতিক স্তরের বহু পুলিশ দপ্তরের সঙ্গে, এমনকি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সঙ্গেও তুলনা করা হতো।”

বিগত সরকার পুলিশের এই দক্ষতাকে সঠিক উপায়ে কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।

পূর্বতন জমানার ‘আক্রান্ত পুলিশ’ ছবি বদলের অঙ্গীকার

উল্লেখ্য, পূর্বতন সরকারের আমলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা গোলমাল ঠেকাতে গিয়ে বারবার পুলিশকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালে গার্ডেনরিচের হরিমোহন ঘোষ কলেজে ছাত্রভোটের গোলমালে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক পুলিশকর্মীর মৃত্যু এবং ২০১৪ সালে আলিপুর থানায় এক রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের তাণ্ডবের জেরে পুলিশকর্মীদের টেবিলের তলায় লুকিয়ে আত্মরক্ষা করার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছিল। যা নিয়ে অতীতে কম বিতর্ক হয়নি।

এই প্রসঙ্গে কড়া বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন,

“আমাদের পুলিশকর্মীরা কেউ আহত হয়ে হাসপাতালে যাবে না। আমাদের পুলিশকর্মীদের গা থেকে রক্ত বেরোবে না। আমরা সেইভাবে সুরক্ষিত পুলিশ বাহিনী তৈরি করব। জনগণের নিরাপত্তা এবং পুলিশের নিরাপত্তা ও তাকে সুরক্ষিত রাখা—উভয়ই এই সরকারের দায়িত্ব এবং সেটাই আমরা করব।”

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম জেলা সফরকালেই শুভেন্দু স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, অপরাধীদের হাতে পুলিশের মার খাওয়া কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। বুধবারের বার্তায় সেই অবস্থান আরও সুনির্দিষ্ট হলো।

কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপর নির্ভরতা হ্রাস ও স্বনির্ভরতার লক্ষ্য

মুখ্যমন্ত্রী জানান, আইন-রক্ষার জন্য রাজ্যকে যাতে বারবার কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপর নির্ভর করে থাকতে না হয়, বাহিনী যাতে স্বনির্ভর হতে পারে—তা নিশ্চিত করাই নতুন সরকারের মূল লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যেই রাষ্ট্রীয় রক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এই মউ স্বাক্ষর করা হয়েছে।

বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও মেধা থাকলেও তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। পুলিশকর্মীদের আত্মরক্ষার জন্য আধুনিক প্রতিরক্ষামূলক সামগ্রী দেওয়া হয়নি এবং দীর্ঘদিন ধরে বাহিনীতে শূন্যপদ পূরণ বা লোকবল বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হয়নি। এর ফলে পুলিশ বাহিনী সাধারণ মানুষের আশা-প্রত্যাশা থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।

স্বচ্ছ নিয়োগ ও ১৬ হাজার কনস্টেবলের কর্মসংস্থান

পুলিশের লোকবল ঘাটতি মেটাতে একগুচ্ছ ইতিবাচক ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আশ্বাস দেন,

  • নতুন নিয়োগ: পুলিশে দ্রুত লোকবল বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা আনা হচ্ছে।
  • প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের নিয়োগ: ইতিমধ্যে যে ১৬ হাজার কনস্টেবল প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে বসে আছেন, তাঁদের দ্রুত কাজে লাগানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করছে সরকার।
  • আধুনিকীকরণ: পুলিশ বাহিনীকে অপরাধ দমনে এবং আত্মরক্ষায় সম্পূর্ণ সক্ষম করে তুলতে আধুনিক যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষামূলক সামগ্রী সরবরাহে সরকার সব ধরনের আর্থিক ও পরিকাঠামোগত মদত দেবে।

প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে রাজ্য পুলিশ তাঁর হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করছেন প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.