নির্ধারিত সময়েই উত্তরবঙ্গে প্রবেশ করেছে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু। তা সত্ত্বেও জুন মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের অন্তত ১০টি জেলায় বৃষ্টির তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতর সূত্রে খবর, ১ থেকে ১৬ জুনের মধ্যে রাজ্যের বেশ কিছু জেলায় বৃষ্টির ঘাটতি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে উত্তর দিনাজপুর। দেশজুড়েও এই সময়ে বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় ৬৪ শতাংশ ছুঁয়েছে।
জেলাভিত্তিক বৃষ্টির খতিয়ান: ঘাটতি ও স্বাভাবিকের চিত্র
আবহাওয়া দফতরের নিয়ম অনুযায়ী, স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ থেকে ৫৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হলে তাকে ‘ঘাটতি’ এবং ৬০ শতাংশের বেশি কম হলে তা ‘অত্যন্ত কম’ বৃষ্টিপাত হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে, নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে ১৯ শতাংশ কম বা বেশি বৃষ্টি হলে তাকে ‘স্বাভাবিক’ ধরা হয়।
তীব্র ঘাটতিপূর্ণ জেলাসমূহ (১-১৬ জুন):
- উত্তর দিনাজপুর: ৪৬.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৭১% কম (অত্যন্ত কম)।
- ঝাড়গ্রাম: বৃষ্টির ঘাটতি ৬১% (অত্যন্ত কম)।
- পশ্চিম বর্ধমান: ঘাটতি ৫৪%।
- কালিম্পং: ঘাটতি ৫২%।
- দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ঘাটতি ৪২%।
- বাঁকুড়া: ঘাটতি ৪১%।
- কলকাতা: ৭৩.১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৯% কম।
- আলিপুরদুয়ার: ঘাটতি ৩০%।
- জলপাইগুড়ি ও দক্ষিণ দিনাজপুর: উভয় জেলাতেই ঘাটতি ২৩%।
স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত: এই একই সময়ে দার্জিলিং, কোচবিহার, মালদহ, বীরভূম, পুরুলিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পূর্ব মেদিনীপুরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিক ছিল।
স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি: রাজ্যের মাত্র পাঁচটি জেলায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে নদীয়া (৫৫%), হাওড়া (৪৫%), মুর্শিদাবাদ (২৭%), হুগলি (২১%) এবং পূর্ব বর্ধমানে (২০%) বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। তবে রাজ্যের কোথাও এখনও ‘অত্যন্ত বেশি’ বৃষ্টি হয়নি।
দেশজুড়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ও উপগ্রহ চিত্র
কেরল হয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডে বর্ষা সঠিক সময়ে প্রবেশ করলেও এবং পশ্চিমবঙ্গসহ কর্নাটক, তেলঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে তা পৌঁছালেও বৃষ্টির দেখা মিলছে না। মৌসম ভবনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪ থেকে ১৫ জুনের মধ্যে দেশজুড়ে মাত্র ১৯.২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হওয়া উচিত ছিল ৫৩.৭ মিলিমিটার।
গত ১৫ জুন কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ছবি আবহবিদদের চিন্তা বাড়িয়েছে। উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, বর্ষা সক্রিয় থাকাকালীন দেশের আকাশে যে মেঘের ঘনঘটা থাকার কথা, তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ভারতের অধিকাংশ এলাকার আকাশ অস্বাভাবিক রকমের পরিষ্কার। শুধুমাত্র হিমালয় সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব ভারত এবং গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে কিছু মেঘ জমতে দেখা গেছে।
কেন এই বৃষ্টির আকাল?
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই পরিস্থিতির জন্য মূলত দুটি কারণ দায়ী:
- শক্তিশালী পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব: বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরের দ্রুতগামী পশ্চিমা বায়ুর স্রোতটি তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে অনেকটাই দক্ষিণে সরে এসেছে। এর ফলে পূর্বমুখী বায়ু স্রোত বাধা পাচ্ছে, যা ভারতে মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ, মেঘ তৈরি ও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ করে। পশ্চিমা বায়ুর বাধার কারণে বাতাসে জলীয় বাষ্প থাকলেও পর্যাপ্ত মেঘ তৈরি হতে পারছে না।
- ‘এল নিনো’-র আবির্ভাব: মৌসম ভবন জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে ইতিমধ্যেই উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত বা ‘এল নিনো’ সক্রিয় হয়েছে। এর প্রভাবে বর্ষার মরশুমে বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে আগে থেকেই আশঙ্কা করছিলেন বিশেষজ্ঞরা।
আগামী দিনের আবহাওয়া পূর্বাভাস
চলতি সপ্তাহের বুধবার উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের কিছু অংশে ভারী থেকে অতি ভারী (৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার) বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া দার্জিলিং, কালিম্পং ও কোচবিহারে ভারী বৃষ্টির (৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার) পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে বুধবার অস্বস্তিকর গরমের কারণে ‘হলুদ সতর্কতা’ জারি করেছে হাওয়া অফিস। তবে উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়ায় হালকা বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে।

