অভিষেকের সঙ্গে কুণালকেও রবিবার ডাকল সিআইডি! সই-কাণ্ডে তৃণমূলের দুই নেতার বয়ান মেলাবে ভবানী ভবন?

অভিষেকের সঙ্গে কুণালকেও রবিবার ডাকল সিআইডি! সই-কাণ্ডে তৃণমূলের দুই নেতার বয়ান মেলাবে ভবানী ভবন?

বিধানসভার সই জাল-কাণ্ডের তদন্তে গতি বাড়িয়ে এবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষকে একই দিনে তলব করল সিআইডি। আগামী ১৪ জুন, রবিবার তাঁদের কলকাতার ভবানী ভবনে (সিআইডি সদর দফতর) হাজির হতে বলা হয়েছে।

এই মামলায় গত বৃহস্পতিবারই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে একবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্তকারীরা। তার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে দ্বিতীয়বার নোটিস পাঠানো হলো। অন্যদিকে, শুক্রবার রাতে নোটিস দেওয়া হয়েছে বিধায়ক কুণাল ঘোষকেও।

একই দিনে অভিষেক ও কুণালকে তলব: ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, রবিবার বেলা ১২টায় ভবানী ভবনে ডাকা হয়েছে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তার ঠিক আড়াই ঘণ্টা পর, অর্থাৎ বেলা আড়াইটেয় হাজিরা দিতে বলা হয়েছে বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষকে। একই দিনে সামান্য সময়ের ব্যবধানে দলের দুই শীর্ষ নেতাকে তলব করায় রাজনৈতিক মহলে ও তৃণমূলের অন্দরে কৌতূহল ও জল্পনা তীব্র হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, সই নিয়ে এই দুই নেতার বয়ানে কোনও ফারাক বা অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতেই এই পদক্ষেপ।

শুক্রবার রাতে সিআইডি-র নোটিস পাওয়ার কথা স্বীকার করে আনন্দবাজার অনলাইনকে কুণাল ঘোষ বলেন:

“হ্যাঁ, আমাকে রবিবার ভবানী ভবনে যেতে বলা হয়েছে। আমি নিজের হাতেই সিআইডি-র চিঠি গ্রহণ করেছি। তদন্তের স্বার্থে আমি সব রকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”

উল্লেখ্য, এর আগে এই মামলার প্রেক্ষিতে কুণাল ঘোষের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বয়ান রেকর্ড করেছিলেন সিআইডি আধিকারিকেরা। এছাড়া শুক্রবার আরও বেশ কয়েকজন তৃণমূল বিধায়কের সঙ্গেও কথা বলেছেন তদন্তকারীরা।

আদালতের নির্দেশ ও ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ

বিধানসভার এই সই জাল-কাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি এর আগেও একাধিকবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোটিস পাঠিয়েছিল। তবে আইনি রক্ষাকবচ চেয়ে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। গত বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানিতে হাইকোর্টের বিচারপতি কৌশিক চন্দের বেঞ্চ নির্দেশ দেয়, ওই দিনই সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অভিষেককে ভবানী ভবনে হাজিরা দিতে হবে এবং তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে। তবে সিআইডি তাঁর বিরুদ্ধে এখনই কোনও কঠোর পদক্ষেপ (যেমন গ্রেফতারি) করতে পারবে না।

আদালতের এই নির্দেশের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভবানী ভবনে যান অভিষেক। সেখানে তাঁকে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পর রবিবার (১৪ জুন) তাঁকে পুনরায় ডাকা হয়েছে। এর ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ সোমবার (১৫ জুন) আবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) তলব করেছে তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতাকে।

কী এই ‘সই-কাণ্ড’ এবং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ?

এই বিতর্কের সূত্রপাত বিধানসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় দলের একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে। বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করে স্পিকারের কাছে পরিষদীয় দলের পক্ষ থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সেই চিঠিতে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেকের স্বাক্ষর ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তৃণমূলের বেশ কয়েকজন বিধায়ক দাবি করেন, তাঁরা ওই চিঠিতে কোনও সই করেননি, অথচ তাঁদের নাম সেখানে রয়েছে। এমনকি কারও কারও নাম ব্লক লেটারে লেখা ছিল।

এই জালিয়াতির অভিযোগে হেয়ার স্ট্রিট থানায় মামলা দায়ের হয়। পরবর্তীকালে পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে এই মামলার তদন্তভার সিআইডি-র হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এরই মধ্যে তৃণমূলের পরিষদীয় দলে বড়সড় ভাঙন ধরেছে। দল থেকে বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় নতুন বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করেছেন ‘বিদ্রোহী’ বিধায়করা। ৫৯ জন বিধায়কের সই সম্বলিত একটি চিঠি ইতিমধ্যেই স্পিকারের হাতে তুলে দিয়েছেন ঋতব্রত। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে এবং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের মূল দায়িত্ব ছেড়ে কেবল ‘পরামর্শদাতা’ হিসেবে থাকার আবেদন জানিয়েছে। সব মিলিয়ে, সই-কাণ্ডের এই আইনি তদন্তের সঙ্গেই জড়িয়ে গিয়েছে রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পালাবদলের আবহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.