যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কুকুরের উপদ্রব নিয়ে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবার এক নতুন মোড় নিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের আবাসন— সাত তলা ভবনের পাঁচতলার একটি সরকারি কোয়ার্টারে গত কয়েক বছর ধরে ১০ থেকে ১২টি কুকুরকে আটকে রাখার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার ক্যাম্পাস চত্বরে তীব্র শোরগোল পড়ে যায়।
ফ্ল্যাটে বন্দি কুকুরের দল: অতিষ্ঠ প্রতিবেশীরা
আবাসনের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই ফ্ল্যাটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের নামে বরাদ্দ। তবে গত বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি সেখানে থাকেন না। অথচ তাঁর ঘরেই ১০-১২টি কুকুরকে আটকে রাখা হয়েছে। দিনে মাত্র একবার এক ব্যক্তি এসে তাদের খাবার দিয়ে যান, বাকি সময় কুকুরগুলি ওই অন্ধকার ঘরের মধ্যেই বন্দি থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, পূর্বে একবার একটি কুকুর ওই ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে নিচে ঝাঁপ দিয়েছিল। তারপর থেকে ফ্ল্যাটের মালিক জানালাটিও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে অবলা পশুগুলি দিনের আলো পর্যন্ত দেখতে পায় না। কুকুরগুলির অনবরত চিৎকারে প্রতিবেশীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
রেজিস্ট্রারের কাছে স্মারকলিপি জমা
শুক্রবার ক্যাম্পাসের বাসিন্দা অধ্যাপক, পড়ুয়া এবং শিক্ষাকর্মীরা একজোট হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সেলিমবক্স মণ্ডলের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন। স্মারকলিপিতে ফ্ল্যাটে কুকুর বন্দি রাখার বিষয়টির পাশাপাশি ক্যাম্পাসে কুকুরের কামড়ানোর ক্রমবর্ধমান ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাসিন্দাদের দাবি, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের আবাসন এলাকাটি অবিলম্বে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে ফেলতে হবে, যাতে বাইরের কোনো কুকুর সেখানে ঢুকতে না পারে। এক শিক্ষকের কথায়, “ভোরবেলা বা রাতে কামড়ানোর ভয়ে আমরা বাড়ি থেকে বেরোতে পারছি না। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি।” স্মারকলিপিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসের ভেতরে কেউ কুকুরে কামড়ালে তাঁর চিকিৎসার সমস্ত খরচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে।
১ মে-র ভয়াবহ স্মৃতি ও অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার কমিটির সুপারিশ
বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার কমিটির এক সদস্য জানান, গত ১ মে বাইরে থেকে আসা একটি ‘পাগল’ কুকুর একদিনে ক্যাম্পাসের প্রায় ৩২ জনকে কামড়েছিল। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেটি ক্যাম্পাসের অন্য কুকুরগুলিকেও কামড়ে থাকতে পারে, যাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি ‘অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার কমিটি’ গঠন করেছেন। কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছিল:
- প্রধান ফটক, ক্যান্টিন বা ক্যাম্পাসের রাস্তার মাঝে কুকুরদের খাবার দেওয়া যাবে না; নির্দিষ্ট স্থানে খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।
- কুকুরদের থাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করতে হবে এবং দ্রুত তাদের নির্বীজকরণ (Sterilization) করাতে হবে।
তবে এই সমস্ত সুপারিশের কোনোটিই এখনো কার্যকর করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারীরা।
দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস কর্তৃপক্ষের
এভাবে বছরের পর বছর কুকুর আটকে রাখাকে ‘বেআইনি’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্মারকলিপি জমা দিতে যাওয়া প্রতিনিধিরা। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সেলিমবক্স মণ্ডল বলেন,
“আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

