কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর তীব্র বিরোধিতা খারিজ করে বড় রায় দিল বিশেষ আদালত। পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ধৃত রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা সুজিত বসুকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে ‘প্রথম শ্রেণির বন্দি’ (Grade 1 Prisoner) হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে আলিপুর জেল থেকে এই বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশ নেন সুজিত বসু।
শুনানি চলাকালীন সুজিত বসুর আইনজীবী তাঁর মক্কেলের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে এই বিশেষ মর্যাদার আবেদন জানান। কেন্দ্রীয় সংস্থা ইডি লিখিতভাবে এর বিরোধিতা করলেও, আদালত শেষ পর্যন্ত সুজিতবাবুর পক্ষেই রায় দেয়।
প্রথম শ্রেণির বন্দি হিসেবে সুজিত বসু যেসব সুবিধা পাবেন
আদালতের এই নির্দেশিকার ফলে কড়া সুরক্ষাবেষ্টিত জেলের অন্দরে সাধারণ কয়েদিদের তুলনায় বেশ কিছু বাড়তি ও উন্নত নাগরিক সুবিধা পাবেন এই তৃণমূল নেতা:
- থাকার ব্যবস্থা: জেলের ভেতরে সুজিত বসুর জন্য বরাদ্দ হবে একটি আলাদা সেল (কক্ষ), যেখানে থাকবে খাট, টেবিল, চেয়ার, ফ্যান এবং মশারি।
- শৌচাগার ও প্রাত্যহিক ব্যবহার্য: সেলের সঙ্গেই থাকবে ‘অ্যাটাচড’ বাথরুম। এ ছাড়া তিনি নিয়মিত টুথপেস্ট ও টুথব্রাশ ব্যবহারের সুবিধা পাবেন (সাধারণ বন্দিরা ব্রাশ পান না, তাঁদের গুঁড়ো মাজন দেওয়া হয়)।
- খাদ্য ও অন্যান্য: সুজিত বসুর জন্য জেলের পরিবর্তে বাড়ি থেকে পাঠানো খাবার খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি প্রতিদিন পড়ার জন্য খবরের কাগজও পাবেন।
- সুরক্ষা: তাঁর সেলের ওপর সার্বক্ষণিক সিসিটিভি (CCTV) নজরদারি বজায় রাখা হবে।
আদালতে ইডির যুক্তি ও প্রভাবশালী তত্ত্ব
শুনানি চলাকালীন ইডির পক্ষে ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল ধীরাজ ত্রিবেদী সুজিত বসুকে প্রথম শ্রেণির বন্দির মর্যাদা দেওয়ার বিরোধিতা করে আদালতে একাধিক যুক্তি পেশ করেন। ইডির দাবি, সুজিত বসু এখনও অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
কেন্দ্রীয় এজেন্সির আইনজীবী আদালতে জানান:
“পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সস্প্রতি বেশ কিছু নতুন তথ্য ও ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের হাতে এসেছে। এই মামলার তদন্তে সুজিত-ঘনিষ্ঠ তথা দক্ষিণ দমদম পুরসভার উপ-পুরপ্রধান নিতাই দত্তকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সমন পাঠানো হয়েছিল। তিনি হায়দরাবাদে চিকিৎসার অজুহাত দেখিয়ে চলতি মাসে হাজিরা দেওয়ার কথা বললেও এখনও আসেননি। সুজিত বসুর প্রভাবের কারণেই একজন সরকারি পদাধিকারী এভাবে তদন্ত এড়িয়ে যাচ্ছেন।”
এর বিপরীতে সুজিত বসুর আইনজীবী পাল্টা সওয়াল করে বলেন, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)-এর জমা দেওয়া চার্জশিটে তাঁর মক্কেলের কোনও নাম নেই। কোনও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বা অন্য কোনও অভিযুক্তের বয়ানেও সুজিতবাবুর প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা উল্লেখ নেই।
পুরনিয়োগ মামলার প্রেক্ষাপট ও সুজিতের পরাজয়
| তদন্তের বিবরণ ও অভিযোগ | রাজনৈতিক অবস্থান ও নির্বাচনী ফলাফল |
| দক্ষিণ দমদম পুরসভায় বেআইনিভাবে কমবেশি ১৫০ জন চাকরিপ্রার্থীর নাম সুপারিশ করার অভিযোগ রয়েছে সুজিত বসুর বিরুদ্ধে। ইডির ধারণা, এই দুর্নীতির টাকা নির্দিষ্ট কিছু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে গিয়েছে। যার কারণে তল্লাশির সময় সুজিতবাবুর বাড়ি, অফিস ও পারিবারিক ধাবায় হানা দেওয়া হয় এবং গত ১১ মে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। | সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে সুজিত বসু তাঁর পুরনো কেন্দ্র বিধাননগর থেকে তৃণমূলের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে বিজেপির তরুণ প্রার্থী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে ৩৭ হাজারেরও বেশি ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হন রাজ্যের এই প্রাক্তন হেভিওয়েট মন্ত্রী। |
আদালতের এই নির্দেশিকার পর ইডি অবশ্য নতুন করে পাওয়া ডিজিটাল তথ্য ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখে সুজিত বসুকে পুনরায় হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আইনি প্রস্তুতি চালাচ্ছে বলে বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে।

