টলিউড স্টুডিওপাড়ায় তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির মারাত্মক অভিযোগে গ্রেফতার করা হলো রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই তথা টলিউডের প্রভাবশালী সংগঠন ‘ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’-র প্রাক্তন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসকে। নিউ আলিপুর থানার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। টালিগঞ্জের টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োর কলাকুশলীদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা তোলা এবং মহিলাদের হেনস্থা করার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মেকআপ আর্টিস্টের অভিযোগ ও বিস্ফোরক তথ্য
পুলিশ সূত্রের খবর, রিজেন্ট পার্ক এলাকার বাসিন্দা ও টালিগঞ্জের মেকআপ আর্টিস্ট ফেডারেশনের সদস্য এক মহিলা প্রথম স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ওই মহিলার অভিযোগ, বিগত প্রায় দুই বছর ধরে তিনি স্টুডিওপাড়ায় কোনও কাজ পাচ্ছিলেন না। পরবর্তীতে কাজ চাইতে গেলে তাঁর কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় এবং তাঁকে নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
অভিযোগকারী মহিলা আরও দাবি করেন, কাজ পাওয়ার জন্য তাঁর এক সহকর্মী ইতিপূর্বেই স্বরূপ বিশ্বাসকে ৪৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্তে নেমে নিউ আলিপুর থানার পুলিশ স্বরূপকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ, ভয় দেখিয়ে ও হুমকি দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছে সে। ধৃত স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) সংশ্লিষ্ট ধারায় শ্লীলতাহানি, তোলাবাজি, খুনের চেষ্টা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং অস্ত্র আইনে (Arms Act) মামলা রুজু করা হয়েছে।
ক্ষমতার পালাবদল ও ফেডারেশনের বিলুপ্তি
টালিগঞ্জের ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ বছর ধরে স্টুডিওপাড়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল স্বরূপ বিশ্বাসের। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন কলাকুশলী ও কর্মচারীদের একাংশের ওপর তার চরম দাপট ছিল বলে অভিযোগ। তবে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। সম্প্রতি স্বরূপের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশনের অস্তিত্বও সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার টালিগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী এই বিষয়ে বড় ঘোষণা করে জানান:
“স্টুডিয়োপাড়ায় এই একনায়কতান্ত্রিক ফেডারেশনের আর কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। এবার থেকে টলিউডের সমস্ত কাজ ও টেকনিশিয়ানদের বিষয় দিল্লি থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। টলিউডের সমস্ত কলাকুশলী সরাসরি দিল্লির ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স কনফেডারেশন’-এর আওতাভুক্ত হবেন। মূলত ইন্ডাস্ট্রিকে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ করতেই এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
ফেডারেশনের ক্ষমতা হারানোর পর এবার আইনি জালে জড়িয়ে শ্রীঘরে যেতে হলো খোদ স্বরূপকে।
ব্যক্তিগত জীবনেও বিপর্যয়, ডিভোর্সের পথে স্ত্রী জুঁই
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক এই চরম বিপর্যয়ের মধ্যেই স্বরূপ বিশ্বাসের ব্যক্তিগত জীবনেও বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কিছুদিন আগেই তাঁর স্ত্রী তথা কলকাতা পুরসভার ৮১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং ১০ নম্বর বরোর চেয়ারপার্সন জুঁই বিশ্বাস প্রকাশ্যেই বিবাহবিচ্ছেদের (Divorce) ঘোষণা করেন।
জুঁই বিশ্বাস সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিগত ২০১৯ সাল থেকে দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি স্বরূপের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকেন। নানাবিধ জটিলতার কারণে এতদিন আইনি পদক্ষেপ করতে না পারলেও, এবার তাঁরা যৌথ আইনি পরামর্শ মেনেই আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করছেন। তবে স্ত্রীর এই ঘোষণার বিপরীতে নিজে কোনও মন্তব্য করতে চাননি স্বরূপ বিশ্বাস। এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অত্যন্ত সংক্ষেপে তিনি বলেছিলেন, “আমি পারিবারিক বিষয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কিছু বলব না।” সব মিলিয়ে টলিউডের এই একদা দাপুটে নেতার রাজনৈতিক, পেশাগত ও পারিবারিক জীবন এখন চরম সংকটের মুখে।

