দীর্ঘ চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে এবার সক্রিয় রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ সন্ন্যাস নেওয়ার ঘোষণা করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী। হুগলির কোন্নগর কানাইপুরের নিজ বাসভবনে বসে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি আর কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না এবং মাঠে-ময়দানে নেমে সক্রিয় রাজনীতিও করবেন না। তবে লেখালেখি, সামাজিক ও রাজনৈতিক পর্যালোচনার মাধ্যমে জনপরিসরে নিজের উপস্থিতি বজায় রাখবেন।
চলতি বিধানসভা নির্বাচনে হুগলির জাঙ্গীপাড়া কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থীর কাছে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হন স্নেহাশিস চক্রবর্তী। এরপর থেকেই তাঁকে আর দলীয় কর্মসূচিতে দেখা যায়নি, এমনকি তৎকালীন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা সাংগঠনিক বৈঠকেও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। অবশেষে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতি ছাড়ার কথা ঘোষণা করে দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন এই প্রাক্তন মন্ত্রী।
“তৃণমূলে বিধায়কদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের পরিসর ছিল না”
তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি ও সাংগঠনিক অসন্তোষ নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে স্নেহাশিস চক্রবর্তী বলেন, দলের মধ্যে বিধায়ক ও সাংসদদের স্বাধীনভাবে নিজস্ব মতামত প্রকাশের পরিধি অত্যন্ত সীমিত ছিল। রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক (I-PAC) নির্ভর পরিচালনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানান, দলের অভ্যন্তরে নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ আরও বেশি থাকলে আজ পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না। নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূলের অনেক জনপ্রতিনিধি যে নিজেদের মতো করে বিরোধী দলনেতা বা অন্যান্য পদ নির্ধারণ করছেন, তাকে দলের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন তিনি।
পরাজয়ের ময়নাতদন্ত ও নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্বের খামতি
জাঙ্গীপাড়ায় নিজের এবং সামগ্রিকভাবে জেলায় দলের পরাজয় প্রসঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী। তিনি বলেন:
“নির্বাচনে পরাজয়ের পর সমালোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের জন্য নিজের মতো করে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, এতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে সবচেয়ে বড় খামতি ছিল জেলা স্তরের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সংগঠনের সাধারণ কর্মীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের অভাব। দলের অনেক নেতা ও কর্মী সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৌঁছতে পারতেন না। এই দূরত্বটাই সংগঠনের মধ্যে একটা বড় ঘাটতি তৈরি করেছিল।”
বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি তীব্র অনীহা
সক্রিয় রাজনীতি থেকে চিরতরে সরে দাঁড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক অবক্ষয়কে দায়ী করেন স্নেহাশিস বাবু। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান রাজনীতির ধরন ও দলের কাজের সংস্কৃতির সঙ্গে তিনি নিজের ভাবনাকে আর মেলাতে পারছেন না। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, “আজ একজনের বিরুদ্ধে বলতে হবে, কাল অন্যজনের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে গিয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহার করা বা ব্যক্তিগত আক্রমণ করা– এই ধরণের রাজনীতি আমি পছন্দ করি না। রাজনীতি হওয়া উচিত মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য। কিন্তু এখানে রাজনীতি মানেই সংঘাত, হিংসা, কুৎসা আর প্রতিশোধের রাজনীতি। এই সংস্কৃতির সঙ্গে আমি নিজেকে আর যুক্ত রাখতে চাই না।”
শুভেন্দু অধিকারী ও নতুন সরকারকে শুভেচ্ছা
রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত হওয়া নতুন বিজেপি সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে যথেষ্ট পরিমিত ও ইতিবাচক সুর শোনা গেছে বিদায়ী এই মন্ত্রীর গলায়। মানুষের রায়কে সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন:
- জনসমর্থন ও নেতৃত্ব: “মানুষ শুভেন্দু অধিকারীকে ভোট দিয়েছে। তিনি অত্যন্ত লড়াকু নেতা এবং সাধারণ মানুষের বিপুল সমর্থন নিয়েই আজ ক্ষমতায় এসেছেন।”
- নতুন সরকারকে সুযোগ: “নতুন সরকারকে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দেওয়া উচিত। মানুষ যে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে রাজ্যে পরিবর্তন এনেছে, সেই প্রত্যাশা তারা কতটা পূরণ করতে পারে, এখন সেটাই দেখার।”
পরিবহণমন্ত্রী হিসেবে নিজের কাজের মূল্যায়ন
সক্রিয় রাজনীতি বিদায় জানালেও মন্ত্রী হিসেবে নিজের তিন বছরের মেয়াদের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেছেন স্নেহাশিস চক্রবর্তী। তাঁর দাবি, পরিবহণ দফতরের দায়িত্ব সামলানোর সময় তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ করেছিলেন। তাঁর কার্যকালেই দফতরের রাজস্বে এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। তিন বছরে রাজস্ব প্রায় ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৪,৭০০ কোটি টাকার গণ্ডি অতিক্রম করেছিল।
আগামী দিনে সক্রিয় রাজনীতির কাদা-ছোড়াছুড়ি থেকে দূরে থেকে পরিবারকে সময় দেওয়া, বই লেখা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কলাম লেখার মাধ্যমেই নিজের অবসর জীবন অতিবাহিত করতে চান চার দশকের এই অভিজ্ঞ রাজনীতিক।

