ফুটবল বিশ্বকাপ—গোটা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে চার বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক মহা-আয়োজন। তবে মাঠের সেই চিরন্তন লড়াই ও গ্যালারির উন্মাদনাকে ছাপিয়ে, ২০২৬ সালের এই মেগা টুর্নামেন্টকে ঘিরে এখন ঘনীভূত হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল চোরাস্রোত। আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশ্বকাপ শুরুর আগেই কূটনৈতিক টানাপোড়েন, সামরিক সংঘাত এবং অভিবাসন নীতির জাঁতাকলে পড়ে ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত প্রতিযোগিতায় পরিণত হতে চলেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে টুর্নামেন্টটি সুষ্ঠুভাবে সফল করাই এখন বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফা (FIFA)-র কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ট্রাম্পের নীতি ও তিন আয়োজক দেশের দ্বিপাক্ষিক তিক্ততা
বিশ্বকাপের এই রাজনৈতিক জটিলতার কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক আগ্রাসী সিদ্ধান্ত। আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষার মতো ক্ষেত্রে সমঝোতা থাকলেও, অনুপ্রবেশ এবং মাদক পাচারের মতো সংবেদনশীল ইস্যু নিয়ে দেশগুলির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বাণিজ্য শুল্ক নীতি, যা প্রতিবেশী দুই দেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যিক সম্পর্কে তিক্ততা বাড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কানাডা ও মেক্সিকো নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির চেষ্টা চালালেও, তিন আয়োজক দেশের এই অভ্যন্তরীণ দূরত্ব বিশ্বকাপে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আগ্রাসী বিদেশ নীতি ও ইউরোপীয় দেশগুলির ‘বয়কট’ হুঁশিয়ারি
চলতি বছরের শুরুতেই মার্কিন কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মোরোস এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আমেরিকায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কিউবা এবং ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের মার্কিন হুঁশিয়ারিতে আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। সামরিক প্রতিরোধের ডাক দেয় ডেনমার্ক এবং পাশে দাঁড়ায় সামরিক জোট নেটো (NATO)।
এই ঘটনার প্রতিবাদে জার্মানি, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে এবং সুইডেনের মতো ইউরোপীয় ফুটবল পরাশক্তিগুলি বিশ্বকাপ বয়কটের হুঁশিয়ারি দেয়। যুক্তরাজ্যের সংসদ তো একধাপ এগিয়ে আমেরিকাকেই বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলে। রাশিয়া ও চিনসহ একাধিক দেশ মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়। জার্মানি বা ইংল্যান্ডের মতো প্রথম সারির দলগুলি টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ালে বিশ্বকাপের জৌলুস হারানোর পাশাপাশি স্পনসররাও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে—এই আশঙ্কায় তড়িঘড়ি আসরে নামেন ফিফা কর্তারা। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
আমেরিকা-ইরান সামরিক সংঘাত ও ট্রাম্পের মন্তব্য
ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই ইজরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে সামরিক হামলা চালায় আমেরিকা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানও এর পাল্টা জবাব দিলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি হয়। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চললেও মাঠের ফুটবলে এর বড় প্রভাব পড়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মন্তব্য করেন,
“বিশ্বকাপে ইরানের জাতীয় ফুটবল দলকে স্বাগত। কিন্তু আমি মনে করি না, এই পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওদের এখানে আসা উচিত।”
এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমদ দোনিয়ামালি বলেন,
“এই দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক আমাদের নেতাকে হত্যা করেছে। তা মাথায় রেখে কোনও পরিস্থিতিতেই আমরা বিশ্বকাপে খেলতে যাব না। আমাদের শিশুরা যেখানে নিরাপদ নয়, সেখানে ফুটবল খেলার কথা ভাবাই উচিত নয়।”
ইরানের এই অনড় অবস্থানের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং আমেরিকার মাটিতে ইরানের খেলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে মার্কিন মাটিতে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান থাকায় ইরান দল তাদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শিবির মেক্সিকোয় সরিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বকাপের সময় ইরানি সমর্থকদের আমেরিকায় প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছে ওয়াশিংটন।
কঠোর মার্কিন অভিবাসন নীতি ও ব্রাজিলের সমর্থকদের জটিলতা
বিশ্বকাপের খেলা দেখতে প্রতিবারই বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ সমর্থক জড়ো হন। তবে আমেরিকার বর্তমান অভিবাসন নীতি ফুটবলপ্রেমীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের মার্কিন ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছে। যদিও বিশ্বকাপের সময় সাময়িক ছাড়ের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেই ছাড়ের তালিকায় রাখা হয়নি চার গুরুত্বপূর্ণ দেশ—হাইতি, আইভোরি কোস্ট, সেনেগাল এবং ব্রাজিলকে।
রাজনৈতিক কারণে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সফলতম দেশ ব্রাজিলের সমর্থকদেরও আমেরিকায় ঢুকতে দিতে নারাজ ট্রাম্প প্রশাসন। অথচ সাম্বা সমর্থকরাই প্রতি বিশ্বকাপে গ্যালারির মূল আকর্ষণ হন। ফলে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বৈষম্য ও হেনস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইবোলা আতঙ্ক ও বিশেষ স্বাস্থ্য নির্দেশিকা
রাজনৈতিক এই ডামাডোলের সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্বেগও। মধ্য আফ্রিকার দুই দেশ গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো (DR Congo) এবং উগান্ডায় মারাত্মক ইবোলা ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কঙ্গো এবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তারা তাদের প্রস্তুতি শিবির বেলজিয়ামে স্থানান্তরিত করেছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার স্বাস্থ্য নির্দেশিকা ‘ইবোলা কোয়ারেন্টইন’ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইবোলা ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলি থেকে আসা ফুটবলার ও সমর্থকদের জন্য তিন আয়োজক দেশই বিশেষ স্বাস্থ্য সতর্কতা ও কড়া বিধিনিষেধ জারি করেছে।
খেলার দুনিয়াকে রাজনীতি ও বিতর্ক থেকে দূরে রাখার চিরন্তন বার্তা থাকলেও, ২০২৬ সালের মেগা বিশ্বকাপ তা কতটা বজায় রাখতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল যথেষ্ট সন্দিহান। সমস্ত বিতর্ককে পাশে ঠেলে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর পারস্পরিক সমঝোতায় ভর করেই এখন টুর্নামেন্ট শুরুর কাউন্টডাউন চলছে।

