শুক্রবার দুপুরে কালবৈশাখীর তীব্র তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলা। আলিপুরে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮৮ কিলোমিটার। ঝড়ের দাপটে একের পর এক গাছ উপড়ে গিয়ে এবং বজ্রাঘাতে রাজ্যজুড়ে এখনও পর্যন্ত অন্তত ৮ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। এর মধ্যে খাস কলকাতাতেই প্রাণ হারিয়েছেন দুই ব্যক্তি। প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ে মৃতদের পরিবারপিছু ৪ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
ঝড় ও বৃষ্টির জেরে কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে ট্রেন ও বিমান পরিষেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। রাজপথের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় শহরজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
কলকাতা ও ঝাড়গ্রামে তিন জনের মৃত্যু
শুক্রবার দুপুর থেকে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি-সহ দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। কলকাতায় দুর্যোগের জেরে দুটি পৃথক ঘটনায় দু’জনের মৃত্যু হয়েছে:
- আউট্রাম ঘাট: ঝড়ের মধ্যে আউট্রাম ঘাটের কাছে আম কুড়াতে গিয়ে এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ঝড়ের দাপটে গাছের ডাল ভেঙে চক্ররেলের ওভারহেড তার ছিঁড়ে পড়লে আগুন ধরে যায় এবং ওই যুবক তার সংস্পর্শে আসেন।
- চেতলা: চেতলার প্রীতম্বর ঘটক লেনে দেওয়াল ধসে প্রবীণকুমার ঠাকুর নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। একটি পাঁচিল তাঁর ওপর ভেঙে পড়লে তাঁকে এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
- ঝাড়গ্রাম: শুক্রবার রাতে নতুন করে ঝাড়গ্রামের লালগড় থানার গোয়ালডাঙা গ্রাম থেকে এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর আসে। মাঠে ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান মুক্তিপদ পাল (৫৯) নামে ওই ব্যক্তি।
এছাড়া, নেতাজি নগরে গাছ ভেঙে এক দম্পতি আহত হয়ে এমআর বাঙুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ফোর্ট উইলিয়মের দক্ষিণ গেটের কাছে এক স্কুটারচালকের ওপর গাছ পড়লেও প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরে বজ্রাঘাতে মৃত ৫
দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে বজ্রপাত কেড়ে নিয়েছে ৫টি তাজা প্রাণ:
- পুরুলিয়া (মৃত ৩): সাঁতুড়ি থানার কাঁকুড়কিয়ারি গ্রামের বাসিন্দা চৈতন্য ধীবর (৫৬) সাইকেলে যাওয়ার সময় বজ্রাঘাতে মারা যান। পুরুলিয়া মফস্বল থানার হুটমুড়ার বাসিন্দা শেখ ছুটু (২৫) এবং বরাবাজার থানার পলমা গ্রামের বাসিন্দা নিমাইচন্দ্র গরাই (৪৬) বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। এই জেলায় আরও দুই ব্যক্তি আহত অবস্থায় পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন।
- पश्चिम মেদিনীপুর (মৃত ২): গোয়ালতোড় থানার আগরবাঁধের জঙ্গলে বন্ধুর জন্মদিনের পিকনিক করার সময় বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয় রূপক চৈরা (১৫) এবং অয়ন গোস্বামী (১৫) নামে দুই নবম শ্রেণির ছাত্রের।
হুগলিতে মৎস্যজীবী নিখোঁজ
চুঁচুড়া চাঁদনি ঘাটে গঙ্গায় নৌকা নিয়ে জাল ফেলার সময় আচমকা ঝড়ে নৌকা উল্টে যায়। খোকন মণ্ডল নামে এক মৎস্যজীবী সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও, অমিত মণ্ডল নামে অপর এক মৎস্যজীবী গঙ্গায় তলিয়ে যান। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী রাত পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়েও তাঁর খোঁজ পায়নি। এছাড়া সিঙ্গুর ও বৈঁচিগ্রামে রাজ্য সড়কের ওপর গাছ উপড়ে পড়ায় যান চলাচল স্তব্ধ হয়ে যায়। ব্যান্ডেল-কাটোয়া শাখায় রেল লাইনে গাছ পড়ায় ৪৫ মিনিট ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
স্তব্ধ বিমান ও রেল পরিষেবা, ব্যাহত জনজীবন
কলকাতায় কালবৈশাখীর জেরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে:
- বিমান ও ট্রেন: তীব্র ঝড়ের কারণে কলকাতা বিমানবন্দরে প্রায় এক ঘণ্টা বিমান ওঠানামা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। মধ্যমগ্রাম স্টেশনের কাছে লাইনে গাছ পড়ায় শিয়ালদহ-বনগাঁ শাখায় ট্রেন চলাচল রাত পর্যন্ত স্বাভাবিক করা যায়নি।
- শহরের যানজট: কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে খবর, শহরের রাসবিহারী, রবীন্দ্র সরোবর, টালিগঞ্জ, পার্ক স্ট্রিট-সহ অন্তত ৩৬টি জায়গায় গাছ উপড়ে পড়েছে। কলকাতা পুরসভা, সিইএসসি, ফায়ার ব্রিগেড ও পুলিশ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় গাছ সরানোর কাজ চালায়।
- অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি: উত্তর ও মধ্য কলকাতার চাঁদনি চক ও ঠনঠনিয়ার মতো এলাকায় জল জমে যায়। সাউথ সিটি মলের কাচ ভেঙে ভেতরে জল ঢুকে পড়ে এবং দক্ষিণ কলকাতার ক্ষুদিরাম মেট্রো স্টেশনের ছাদের একাংশ ভেঙে পড়ে।
মুখ্যমন্ত্রীর আর্থিক সাহায্য ঘোষণা
নবান্নের তরফে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
নবান্নের ঘোষণা: “প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতদের পরিবারকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ৪ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি আহতদের সম্পূর্ণ চিকিৎসার খরচ ও দায়িত্ব বহন করবে সরকার।”

