বিয়ের পর কেন স্বামী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা স্ত্রীর ওপর মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালান? কেনই বা কনে ও তাঁর পরিবারকে বারবার হেনস্থার শিকার হতে হয়? ২০১০ সালের একটি মর্মান্তিক মামলার প্রেক্ষিতে আইনি শুনানির সময় সমাজ ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে এমনই কঠোর ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তুলল দেশের শীর্ষ আদালত (Supreme Court)।
পণের দাবিতে এই ধরনের নারকীয় হেনস্থা আর কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়ার ডিভিশন বেঞ্চ। একই সঙ্গে বিচারপতিরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, পণপ্রথার মতো কুপ্রথার ক্ষেত্রে সমাজের তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ অংশের একাংশের আচরণও অত্যন্ত হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক।
পটভূমি: ২০১০ সালের সেই মর্মান্তিক ঘটনা
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় ছত্তীসগঢ়ের এক তরুণীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয় তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে। মৃত তরুণীর পরিবারের অভিযোগ ছিল, বিয়ের পর থেকেই অতিরিক্ত পণ হিসেবে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ এবং গাড়ির দাবিতে তাঁর ওপর লাগাতার অত্যাচার চালানো হতো।
মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে ওই তরুণীর দরিদ্র বাবা বহু কষ্ট করে ৬০ হাজার টাকা জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ, সেই সামান্য টাকা দেওয়ার পরও বরের বাড়ির লোকজন কনের পরিবারকে ‘ভিখারি’ বলে চরম অপমান ও মানসিক হেনস্থা করে। এই অপমানের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নেন ওই তরুণী।
পরবর্তীতে শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা (Abetment of Suicide) এবং পণপ্রথার কারণে মৃত্যুর (Dowry Death) মতো ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক কঠোর ধারায় মামলা রুজু হয়। এই মামলায় নিম্ন আদালত মৃতের দেওরকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা শোনায়। পরবর্তীতে ছত্তীসগঢ় হাইকোর্টও সেই রায় বহাল রাখে। এবার সুপ্রিম কোর্টও নিম্ন আদালতের সেই সাজাই বহাল রাখল এবং অভিযুক্তের আপিল আবেদন খারিজ করে দিল।
“কনের পরিবারকে শোষণ করা হয়েছে”: শুনানিতে ক্ষুব্ধ বিচারপতিরা
শুনানি চলাকালীন ছত্তীসগঢ়ের ওই তরুণীর দেওরের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ (গার্হস্থ্য হিংসা ও নিষ্ঠুরতা) ধারায় মামলার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি কড়া ভাষায় বলেন:
“ছেলেরা কেন মেয়েদের বিয়ে করে আর তার পর তাঁদের ও তাঁদের পরিবারকে এভাবে অপমান করে? এটা কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যাবে না। সমাজে এই বার্তা কঠোরভাবে পৌঁছে দেওয়া দরকার।”
আদালতে অভিযুক্তের আইনজীবীকে তীব্র ভর্ৎসনা করে বিচারপতি নাগরত্ন আরও বলেন, “আপনার এখন চুপ করে থাকাই শ্রেয়। যেভাবে আর্থিক জবরদস্তি করা হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে কনের পরিবারকে নির্মমভাবে শোষণ করার চেষ্টা হয়েছে। বরের পরিবার ঠিক কী বলেছিল? বলেছিল— ‘আপনারা ভিখারি, টাকা দিতে পারছেন না।’ যেখানে নিজের মেয়ের প্রাণ বাঁচাতে একটি পরিবার অনুনয়-বিনয় করছিল, বাবা ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেখানে আপনারা তাঁদের ভিখারি বলে অপমান করলেন?”
‘শিক্ষিত’ সমাজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
শুনানির এক পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্ট গভীর আক্ষেপের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে যে, বর্তমানে সমাজের উচ্চশিক্ষিত শ্রেণির মধ্যেও বিয়ের পর কনেপক্ষের কাছে পণ দাবি করা এবং তাঁদের হেয় প্রতিপন্ন করার এই মানসিকতা যেন একপ্রকার ‘স্বাভাবিক’ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া তীব্র কটাক্ষ করে মন্তব্য করেন, “এঁরা নাকি সব সমাজের শিক্ষিত নাগরিক!”
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সম্প্রতি ভোপালে মডেল-অভিনেত্রী ত্বিশা শর্মার চাঞ্চল্যকর রহস্যমৃত্যুর মামলাটিকে ঘিরে যখন তোলপাড় চলছে দেশজুড়ে, ঠিক সেই আবহে পণপ্রথা ও বধূ নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া অবস্থান ও পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং সামাজিক ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কড়া বার্তা।

