পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য প্রশাসনে পালাবদলের পর দেশীয় সীমান্ত সুরক্ষাকে নিশ্ছিদ্র করতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল নতুন রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ (BSF)-কে পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য জমি দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি শুভেন্দু অধিকারী দিয়েছিলেন, তা দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বুধবার রাতে নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক হ্যান্ডলে একটি পোস্টের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এ যাবৎকাল বিএসএফ-কে মোট ১৪২.৭৯ একর জমি সফলভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। হস্তান্তরিত এই কৌশলগত জমিতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং বিএসএফের নতুন আউটপোস্ট বা সীমান্ত চৌকি স্থাপন করা হবে।
৪৫ দিনে ৬০০ একর জমির লক্ষ্যমাত্রা: একটি বিশেষ মাইলফলক
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী লিখেছেন:
“সীমান্ত সুরক্ষায় আরও নিবিড় পদক্ষেপ গ্রহণ করল বর্তমান রাজ্য সরকার। প্রাথমিক পর্বের পর আবারও বিএসএফ-কে নতুন পর্যায়ে জমি হস্তান্তর করায় মোট হস্তান্তরিত জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াল ১৪২.৭৯ একর। এই জমিতে বিএসএফ আউটপোস্ট ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ফলে আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকা আরও সুরক্ষিত হবে।”
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার (Cabinet) বৈঠকেই ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ-কে মোট ৬০০ একর জমি হস্তান্তর করার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিল। সেই জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত লক্ষ্য পূরণের পথে এই ১৪২.৭৯ একর জমি হস্তান্তর ‘একটি বিশেষ মাইলফলক’। এই মেগা প্রক্রিয়াটি নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য ভূমি ও ভূমি রাজস্ব সচিব এবং রাজ্যের মুখ্যসচিবকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেলাভিত্তিক খতিয়ান: শীর্ষে মুর্শিদাবাদ ও জলপাইগুড়ি
মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশিত জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর থেকে দক্ষিণ— সমগ্র সীমান্ত অঞ্চলেই এই জমি হস্তান্তরের কাজ চলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জমি দেওয়া হয়েছে মুর্শিদাবাদ ও জলপাইগুড়ি জেলায়।
নিচে জেলাভিত্তিক জমি হস্তান্তরের একটি সারণী দেওয়া হলো:
| জেলার নাম | হস্তান্তরিত জমির পরিমাণ (একরে) |
| মুর্শিদাবাদ | ৩৮.৮০৫ একর (সর্বোচ্চ) |
| জলপাইগুড়ি | ৩৫.১৬৫ একর |
| কোচবিহার | ২২.৯৫ একর |
| দক্ষিণ দিনাজপুর | ২০.১৭০১ একর |
| মালদহ | ১০.৯০ একর |
| দার্জিলিং | ৮.৮১৫ একর |
| উত্তর দিনাজপুর | ২.৮৪ একর |
| উত্তর ২৪ পরগনা | ২.৬ একর |
| নদিয়া | ০.৫৫ একর |
পূর্বতন সরকারের ‘তুষ্টিকরণের রাজনীতি’কে তীব্র আক্রমণ
কয়েক দিন আগেই নবান্নে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক সীমান্তের প্রায় ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ অরক্ষিত এলাকাকে কাঁটাতারের বেষ্টনীতে মুড়ে ফেলতেই এই জমি দেওয়া হচ্ছে এবং এটি কেবল একটি সূচনা মাত্র। রাজ্যের দেশপ্রেমিক জনগণ এবং দক্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকেরা যৌথভাবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করবেন।
পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে তীব্র কটাক্ষ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ভারতের মোট ৪,০০০ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্তের মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই রয়েছে দীর্ঘ ২,২০০ কিলোমিটার সীমান্ত। দেশের অন্যান্য সীমান্ত লাগোয়া রাজ্যগুলি বিএসএফ-এর চাহিদা মতো জমি দিলেও, এই রাজ্যে ২,২০০ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র ১,৬০০ কিলোমিটারে কাঁটাতার রয়েছে। বাকি ৬০০ কিলোমিটার এলাকা সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রীর সাফ অভিযোগ, পূর্বতন রাজ্য সরকার চাইলেই অনেক আগে এই জমি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দিতে পারত। কিন্তু শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থে এবং ‘তুষ্টিকরণের রাজনীতি’র কারণেই এতদিন এই জমি দেওয়া হয়নি, যা দেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। নতুন সরকারের এই কড়া ও দ্রুত পদক্ষেপের ফলে সীমান্ত অপরাধ এবং অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

