‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের সমস্ত ত্রুটি ও ‘বেনোজল’ দূর করে রাজ্যে নতুন ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ বা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ চালুর বিস্তারিত রূপরেখা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার নবান্নে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, অন্নপূর্ণা যোজনার একটি নির্ভুল ও স্বচ্ছ তালিকা তৈরি করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। একই সাথে তিনি নিশ্চিত করেছেন, নতুন এই স্থায়ী সরকারি প্রকল্পের ফর্ম রাজ্যের সকল উপভোক্তাকেই পূরণ করতে হবে।
এর পাশাপাশি, সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াতের জন্য বিশেষ কার্ড চালুর কথাও ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার।
কারা পাবেন আর কারা বাদ পড়বেন?
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, কেবল প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক এবং আর্থিকভাবে দুর্বল মহিলারাই এই অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন। প্রকল্পের আওতা থেকে যাঁরা বাদ পড়বেন তাঁরা হলেন:
- আয়কর দাতা (Tax Payers)
- সরকারি চাকুরিজীবী
- নিয়মিত বেতনভোগী বা নিয়মিত পেনশন প্রাপক
নাগরিকত্ব ও ব্যতিক্রমী নিয়ম: সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ (CAA)-র অধীনে যাঁরা ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন, তাঁরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া, বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, কিন্তু বর্তমানে তাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদন জানিয়েছেন— তাঁদেরও আপাতত ব্যতিক্রম হিসেবে এই তালিকায় রাখা হচ্ছে।
‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর ৩০ লাখ ভুয়ো উপভোক্তা বাদ
প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক ধারণা ছিল যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের তালিকাটি যাচাই করা আছে, কিন্তু বাস্তবে সেখানে ভূরি ভূরি জালিয়াতি ও অনিয়ম সামনে এসেছে। সরকারি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভোটার তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে নাম বাদ গিয়েছে এবং ট্রাইবুনালে কোনো আবেদনও করেননি, এমন প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ নিয়মিত লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পাচ্ছেন। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার চালুর মাধ্যমে এই সমস্ত ভুয়ো উপভোক্তাদের নাম স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হবে।
তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই: ৯০ দিন চলবে প্রক্রিয়া
মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, ফর্ম পূরণের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে হুড়োহুড়ি বা তাড়াহুড়ো করার কোনো প্রয়োজন নেই। আগামী ১ জুন থেকে পরবর্তী ৯০ দিন (প্রায় তিন মাস) এই আবেদন প্রক্রিয়া চালু থাকবে।
যত দিন না কোনো উপভোক্তার অন্নপূর্ণা যোজনার নাম নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, তত দিন পর্যন্ত তিনি আগের মতোই ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর টাকা পেতে থাকবেন। তবে নতুন প্রকল্পের অধীনে নাম নথিভুক্ত হওয়া মাত্রই পুরনো লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ হয়ে যাবে। যাঁরা আগামী ২ জুনের মধ্যে নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন, তাঁরা জুন মাস থেকেই অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাওয়া শুরু করবেন।
ব্যাপক পরিধি: বাড়ি বাড়ি যাবেন সরকারি কর্মীরা
ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম প্রকাশ করা হয়েছে। অনলাইন ও অফলাইন— দুই মাধ্যমেই এই ফর্ম পূরণ করা যাবে। এই মেগা প্রকল্পের কাজের পরিধি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান:
- যাঁরা নিজে থেকে ফর্ম পূরণ করতে পারবেন না, সরকারি আধিকারিকেরা সরাসরি তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম পূরণে সহায়তা করবেন।
- নবনির্বাচিত বিধায়কদেরও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- আগামী ১৫, ১৬ এবং ১৭ তারিখ রাজ্যজুড়ে বিশেষ ‘জনকল্যাণ শিবির’ আয়োজন করা হবে, যেখান থেকে ফর্ম পূরণ করা যাবে।
- মুখ্যসচিব এবং অর্থসচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের দল এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করবে। ভোটার তালিকা এবং পরিচয়পত্র যাচাইকরণের কাজে যুক্ত কর্মীরাই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।
এই ফর্মে নাগরিকদের পরিবার সংক্রান্ত বিশদ তথ্য চাওয়া হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য সরকারি সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের ডেটাবেস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। রাজ্য সরকারের মহিলা ও শিশুকল্যাণ দফতরের মাধ্যমে এই পুরো প্রকল্পটি নিয়ন্ত্রিত হবে।
প্রতি সপ্তাহে খতিয়ান ও বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের কার্ড
মহিলা ও শিশুকল্যাণমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল প্রতি সপ্তাহে সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্যবাসীকে জানিয়ে দেবেন যে সেই সপ্তাহে কত জন মহিলার নাম অন্নপূর্ণা যোজনায় নথিভুক্ত করা সম্ভব হলো।
পাশাপাশি, নারীদের কল্যাণে সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াতের কর্মসূচি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক স্তরে রাজ্যের সমস্ত মহিলাই এই সুবিধা পাবেন। তবে পরবর্তীতে এর অপব্যবহার রুখতে এবং প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করতে মহিলাদের জন্য একটি বিশেষ ‘কার্ড’ ইস্যু করা হবে।

