আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কর্তব্যরত তরুণী চিকিৎসককে নৃশংস ধর্ষণ-খুন এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি নিয়ে ফের বিস্ফোরক মুখ খুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের চিকিৎসক নেতা তথা প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ ড. শান্তনু সেন। রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আর রাখঢাক না রেহে শান্তনু সেন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আরজি করের ঘটনা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য দুর্নীতির কিনারে নতুন বিজেপি সরকারের যেকোনো তদন্ত কমিটিকে সব রকম তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করতে তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (IMA)-এর সর্বভারতীয় প্রাক্তন সভাপতি এবং আইএমএ বেঙ্গল স্টেট ব্রাঞ্চের বর্তমান রাজ্য সম্পাদক শান্তনু সেনের এই অবস্থান দলবদল ও ক্ষমতাচ্যুতির আবহে তৃণমূল কংগ্রেসকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।
“উত্তরবঙ্গ লবি ও হুমকি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমিই প্রথম মুখ খুলেছিলাম”
বুধবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে স্বাস্থ্যক্ষেত্রের অন্দরের সিন্ডিকেট ও ‘হুমকি সংস্কৃতি’র (Threat Culture) বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান শান্তনু সেন। তিনি সরাসরি বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী চিকিৎসক নেতার নাম উল্লেখ করে বলেন:
“চিকিৎসক এসপি দাসের নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গ লবির কাণ্ডারি সুদীপ্ত রায়, সুশান্ত রায়, সন্দীপ ঘোষ, অভীক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাস ও সৌরভ পালদের মাধ্যমে রাজ্য স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল, রিক্রুটমেন্ট বোর্ডসহ বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির আখড়া তৈরি হয়েছিল। আমিই এর বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার হয়েছিলাম। তৎকালীন রোগীকল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান হিসেবে আরজি করের সমস্ত দুর্নীতির খতিয়ান তথ্যপ্রমাণসহ তৎকালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু বিচার পাওয়ার বদলে উল্টে আমাকেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”
মুখ খোলায় পরিবারকে হেনস্থা, মেয়ের অনার্স কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা
আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনকে সমর্থন করা এবং ‘রাতদখল’ কর্মসূচিতে রাস্তায় নামার খেসারত তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে দিতে হয়েছিল বলে দাবি করেন শান্তনু সেন। অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি অভিযোগ করেন, আরজি কর পর্বে নির্মম সত্যি কথা বলার অপরাধে তাঁর ওপর নির্মম মানসিক ও পেশাগত অত্যাচার চালানো হয়।
তিনি বলেন, “আমার একমাত্র মেয়ে আরজি করেরই ছাত্রী। মুখ খোলার পর তার ওপর সাংঘাতিক মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি পরীক্ষায় অনার্স পাওয়া সত্ত্বেও আমার মেয়েকে ফেল করানোর চক্রান্ত করা হয়েছিল। আমাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল, আর একটা কথা বললে আমার মেয়ে কীভাবে ডাক্তার হয়, তারা দেখে নেবে। একজন বাবা হিসেবে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তখন আমাকে বাধ্য হয়ে চুপ করে যেতে হয়েছিল।”
এখানেই শেষ নয়, শান্তনু সেনের দাবি— তাঁর বৈধ ফেলোশিপকে জোরপূর্বক ‘অবৈধ’ তকমা দেওয়া হয় এবং চিকিৎসক হিসেবে তাঁর সরকারি রেজিস্ট্রেশন পর্যন্ত বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে তৎকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকেরা কতটা হিংস্র ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছিল।
তৃণমূলের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ‘বেসুরো’ শান্তনু
আরজি কর আবহে দলের লাইনের বাইরে গিয়ে মন্তব্য করায় শান্তনু সেনকে প্রথমে তৃণমূলের মুখপাত্রের পদ থেকে সরানো হয়। তার কয়েক মাসের মধ্যেই দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য তাঁকে দল থেকে সাসপেন্ড করে তৃণমূলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি। পরবর্তীতে ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সেবাশ্রয়’ কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা যায় তাঁকে।
চলতি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার চলাকালীন তৃণমূলের পক্ষ থেকে ড. সেনের সাসপেনশন প্রত্যাহার করে পুনরায় তাঁকে দলের মুখপাত্র পদে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তবে নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি এবং রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তিনি পুনরায় ‘বেসুরো’ হয়ে উঠলেন।
শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ ও নতুন সরকারকে সাধুবাদ
কিছু দিন আগেই সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারকে অভিনন্দন এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন শান্তনু সেন। বুধবার তিনি বর্তমান সরকারের নতুন পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেন,
“বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উদ্যোগে আরজি করের দুর্নীতি এবং ধর্ষণ-খুনের ঘটনার তদন্ত নতুন করে শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই। তদন্তের স্বার্থে যেকোনো প্রয়োজনে আমি প্রশাসনকে সব রকমভাবে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”

