আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা, তারপরেই একটি বড় ‘সুখবর’ পেতে চলেছে গোটা বিশ্ব। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর রবিবার দিল্লিতে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে এমনই এক ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করলেন চার দিনের ভারত সফরে আসা আমেরিকার বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো। কূটনৈতিক মহলের প্রবল ধারণা, মার্কিন বিদেশসচিবের এই ইঙ্গিত মূলত আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আসন্ন ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি বা সমঝোতার দিকেই।
রুবিয়োর এই মন্তব্যের কিছু আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ মাধ্যমে একটি পোস্টে দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। ট্রাম্প লিখেছেন:
“চুক্তিটি প্রায় সম্পন্ন হওয়ার দিকে এবং বর্তমানে এটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে। শীঘ্রই এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হবে। এই চুক্তিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো হরমুজ প্রণালী। চুক্তির অংশ হিসেবে এই কৌশলগত প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বার্তার পরেই নয়াদিল্লিতে বসে মার্কিন বিদেশসচিবের মুখে ‘সুখবরের’ আশ্বাস সেই ধারণাকেই আরও জোরালো করে তুলেছে।
ভারত-আমেরিকা বৈঠক: গুরুত্ব পেল সন্ত্রাসবাদ ও পশ্চিম এশিয়া
রবিবার সকালে দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার (মধ্যপ্রাচ্য) বর্তমান অশান্ত পরিস্থিতি এবং বিশ্ব নিরাপত্তা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্পষ্ট জানান, ‘সন্ত্রাসবাদ দমন’ বর্তমান সময়ে ভারত ও আমেরিকা দুই দেশের কাছেই অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্য দিকে, ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মার্কিন বিদেশসচিব রুবিয়ো বলেন, “ভারত ও আমেরিকা কেবল সাধারণ সহযোগী দেশ নয়, দুই দেশ একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ ‘কৌশলগত অংশীদার’ (Strategic Partners)।” ভারতের সঙ্গে এই অনন্য সম্পর্কের পরিধি ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, “আমরা সারা বিশ্বের বহু দেশের সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করি। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত অংশীদারি এই সম্পর্ককে এক বিশেষ স্তরে নিয়ে গিয়েছে, যা কেবল এই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে তা পশ্চিম গোলার্ধসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করে দেয়।”
কলকাতায় মাদার হাউস দর্শন ও মোদীর সঙ্গে বৈঠক
চার দিনের ভারত সফরের অংশ হিসেবে সুইডেন থেকে শনিবার সকালে সরাসরি কলকাতায় এসে পৌঁছান মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো। কলকাতা বিমানবন্দরে নেমেই তাঁর কনভয় চলে যায় তালতলার মাদার হাউসে। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা সময় কাটানোর পাশাপাশি তিনি ‘নির্মলা শিশুভবন’-ও পরিদর্শন করেন। কলকাতায় পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করে শনিবার দুপুরেই তিনি দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
দিল্লিতে পৌঁছানোর পর সেবাতীর্থে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন মার্কিন বিদেশসচিব। ঘণ্টাব্যাপী চলা এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউস পরিদর্শনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান রুবিয়ো।
মার্কিন বিদেশসচিবের সঙ্গে এই ফলপ্রসূ বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন:
“আমরা ভারত ও আমেরিকার কৌশলগত অংশীদারি আরও সুদৃঢ় করার বিষয়ে আলোচনা করেছি। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শান্তি এবং নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিও আমাদের আলোচনায় স্থান পেয়েছে।”
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ভারত-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার হওয়া এবং অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি— সব মিলিয়ে মার্কিন বিদেশসচিবের এই ভারত সফর বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।

