গোলপার্থক্যের রোমাঞ্চে ২২ বছর পর ভারতসেরা ইস্টবেঙ্গল: সবুজ-মেরুন শিবিরের কটাক্ষ ও প্রাক্তনদের চুলচেরা বিশ্লেষণ

গোলপার্থক্যের রোমাঞ্চে ২২ বছর পর ভারতসেরা ইস্টবেঙ্গল: সবুজ-মেরুন শিবিরের কটাক্ষ ও প্রাক্তনদের চুলচেরা বিশ্লেষণ

২০১৯ সালের এক দিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপে লর্ডসের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মূল ম্যাচ এবং সুপার ওভার— দুই-ই টাই হওয়ার পর বাউন্ডারি গণনার (সবচেয়ে বেশি চার মারার) নিয়মে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইংল্যান্ড। ক্রিকেট ইতিহাসে ইংরেজদের সেই ট্রফি জয় নিয়ে আজও যেমন খোঁচা দেন বিরোধীরা, ঠিক তেমনই দীর্ঘ ২২ বছর পর লাল-হলুদের লিগ জয় নিয়ে ময়দানে শুরু হয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধানের সমর্থকদের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। আইএসএল খেতাব নির্ধারণের পর মোহনবাগান সমর্থকদের একাংশের প্রশ্ন, “কত পয়েন্টের ব্যবধানে জিতলি তোরা?”

পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর নেই। কারণ এবারের ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (ISL)-এর টেবিলে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান— দুই দলেরই অর্জিত পয়েন্ট সমান। ১৩ ম্যাচে দুই প্রধানেরই ঝুলিতে রয়েছে ২৬ পয়েন্ট। তবে গোলপার্থক্যে (+৫) এগিয়ে থাকার সুবাদে ট্রফি ঘরে তুলেছে অস্কার ব্রুজোর ইস্টবেঙ্গল। লিগে লাল-হলুদের গোলপার্থক্য যেখানে +১৯, সেখানে রানার্স-আপ মোহনবাগানের গোলপার্থক্য +১৪।

মহমেডান ম্যাচ ঘিরে জল্পনা ও পারফরম্যান্সের খতিয়ান

লিগ চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণে সবথেকে বড় ভূমিকা নিয়েছে কলকাতার তৃতীয় প্রধান মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের বিরুদ্ধে দুই দলের ম্যাচের ফলাফল। লিগে মহমেডানকে ৭-০ গোলের রেকর্ড ব্যবধানে হারিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল, যা এবারের আইএসএলের বৃহত্তম জয়। অন্যদিকে, মোহনবাগান সাদা-কালো ব্রিগেডকে হারিয়েছিল ৫-১ ব্যবধানে। কেবল মহমেডান ম্যাচ ধরলেই মোহনবাগানের তুলনায় ইস্টবেঙ্গল ৩ গোল বেশি পেয়েছিল। যুবভারতীতে মোহনবাগানের শেষ ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কিছু সবুজ-মেরুন সমর্থককে মহমেডান ম্যাচটি ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে দেখা যায়।

তবে বাস্তব চিত্র বলছে, শতবর্ষ প্রাচীন ক্লাব মহমেডান স্পোর্টিংয়ের এবারের আইএসএল অভিযান ছিল অত্যন্ত বিপর্যয়কর। ১৩টি ম্যাচের একটিতেও জিততে না পেরে, মাত্র ৩টি ড্র ও ১০টি হার নিয়ে ৩ পয়েন্ট পেয়ে টেবিলের তলানিতে (১৪ নম্বরে) শেষ করে তাদের অবনমন ঘটেছে। এবারের প্রতিযোগিতায় মহমেডানই ছিল একমাত্র দল, যাদের কোনো বিদেশি ফুটবলার ছিল না। ট্রান্সফার ব্যান, বিনিয়োগকারীদের সাথে ক্লাব কর্তৃপক্ষের বিরোধ এবং কোচ-ফুটবলারদের বকেয়া বেতনের সমস্যার কারণে চরম সংকটে ছিল তারা। প্রাক্তন ফুটবলার মেহেরাজউদ্দিন ওয়াডুকে মূলত তরুণ ও অনভিজ্ঞ ভারতীয় ফুটবলারদের নিয়েই লড়াই চালাতে হয়েছে। পুরো মরসুমে তারা মোট ৩২টি গোল হজম করেছে, যার গড় ম্যাচ প্রতি ২.৪৬।

পরিসংখ্যানের নিরিখে দুই প্রধানের তুলনা

প্রতিযোগিতার শুরুর দিকে মোহনবাগান অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। পঞ্চম রাউন্ডের শেষে মোহনবাগানের পয়েন্ট ছিল ১৩ এবং ইস্টবেঙ্গলের ছিল মাত্র ৮। তবে পরবর্তী ৮টি ম্যাচে চমত্কারভাবে ঘুরে দাঁড়ায় লাল-হলুদ ব্রিগেড।

লিগের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান:

  • সর্বমোট গোল: ইস্টবেঙ্গল ১৩ ম্যাচে করেছে ৩০টি গোল (ম্যাক্সিমাম ২.৩ প্রতি ম্যাচ)। মোহনবাগান সমসংখ্যক ম্যাচে করেছে ২৩টি গোল (১.৭৬ প্রতি ম্যাচ)।
  • ডিফেন্স: দুই দলই ৫টি করে ম্যাচে কোনো গোল খায়নি (ক্লিন শিট)। তবে মোহনবাগানের তুলনায় ২টি গোল বেশি হজম করেছে ইস্টবেঙ্গল।
  • ব্যর্থতা: মোহনবাগানের দলে অনিরুদ্ধ থাপা, সাহাল আব্দুল সামাদ, বিশাল কাইথদের মতো তারকা ভারতীয় এবং জেসন কামিংস ও দিমিত্রি পেত্রাতোসের মতো চেনা বিদেশি থাকা সত্ত্বেও জেমি ম্যাকলারেন ছাড়া বাকিরা ফর্মে ছিলেন না। ব্রাজিলের রবিনহো রবসন চোটের কারণে অধিকাংশ সময় মাঠের বাইরেই ছিলেন।

অন্যদিকে, ইস্টবেঙ্গল দলেও মহেশ সিংহ বা সাউল ক্রেসপোর মতো তারকাদের চোটের সমস্যা ছিল। কিন্তু কোচ অস্কার ব্রুজোর তৈরি করে দেওয়া ‘হার না মানা মানসিকতা’র জোরে খাতায়-কলমে কিছুটা পিছিয়ে থেকেও মাঠের লড়াইয়ে বাজিমাত করেছে তারা।

‘ম্যানেজ’ বিতর্ক ও আত্মতুষ্টির তত্ত্ব ওড়ালেন প্রাক্তনেরা

স্রেফ মহমেডান ম্যাচের জন্য ইস্টবেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে— এই তত্ত্ব মানতে নারাজ ময়দানের প্রাক্তনেরা। দুই ক্লাবের হয়েই জাতীয় লিগ জয়ী প্রাক্তন ফুটবলার দীপেন্দু বিশ্বাস এই ব্যর্থতার জন্য মোহনবাগানকেই দায়ী করেছেন। তাঁর বক্তব্য:

“লিগ ফরম্যাটে গোলপার্থক্য সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। মহমেডানের অনেক অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ট্রান্সফার ব্যান ছিল, কোনো বিদেশি ছিল না। আমাদের দুর্বলতার সুযোগ সবাই নিয়েছে, ইস্টবেঙ্গল তা বেশি কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু মোহনবাগান তো ইন্টার কাশী ম্যাচটা জিতলেই চ্যাম্পিয়ন হতো। ঘরের মাঠে সেই ম্যাচ ড্র করার মাশুল ওদের দিতেই হতো।”

অন্যদিকে, প্রাক্তন গোলরক্ষক সংগ্রাম মুখোপাধ্যায় মোহনবাগান শিবিরের অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি এবং পরিকল্পনাহীনতাকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তিনি বলেন:

“মোহনবাগান ভালো শুরু করলেও লিগের মাঝে হঠাৎ ফুটবলারদের ছুটি দেওয়ায় দলের তাল কেটে যায়। সবচেয়ে অবাক লেগেছে ইন্টার কাশী ম্যাচে কোচ সের্জিও লোবেরার দল নির্বাচন দেখে। শুভাশিস বোস, লিস্টন কোলাসোদের মতো প্রধান ফুটবলারদের প্রথম একাদশে না রাখাটা ছিল চরম আত্মতুষ্টির লক্ষণ। সুযোগ বুঝে গোলপার্থক্য বাড়িয়ে নেওয়াটা ইস্টবেঙ্গলের পেশাদারিত্বের পরিচয়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ফুটবলের পেশাদারিত্বের যুগে কোনো ম্যাচকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। গোলপার্থক্যের নিরিখে লিগ জয় ফুটবলের ইতিহাসে কোনো নতুন বা বিরল ঘটনা নয়। ফলে সমস্ত সমালোচনা ও ময়দানি ঈর্ষাকে সরিয়ে রেখে যোগ্য দল হিসেবেই ২২ বছর পর ভারতসেরার মুকুট মাথায় তুলল ইস্টবেঙ্গল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.