মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাই-প্রোফাইল সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে চিন সফরে গেলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বুধবার বেজিং-এর ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অফ দ্য পিপল’-এ চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মধ্যে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শীর্ষ স্তরের এই দ্বিপাক্ষিক ও প্রতিনিধি দল পর্যায়ের বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও জ্বালানিসহ একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে ২০টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
চিনের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলির মূল ক্ষেত্র ছিল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবন, গণমাধ্যম এবং কৃত্রিম মেধা সম্পদ সুরক্ষা (Intellectual Property Protection)। বৈঠকে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ঐক্য, কৌশলগত সমন্বয় এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে পশ্চিমি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি অভিন্ন প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
পুতিন-জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের ৫টি মূল নির্যাস
প্রকাশিত প্রতিবেদন ও যৌথ বিবৃতির ভিত্তিতে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের এই মেগা বৈঠকের পাঁচটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ঐতিহাসিক মৈত্রীচুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি
মস্কো ও বেজিং-এর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক সমীকরণকে মাথায় রেখে এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও সুদৃঢ় করতে এই ঐতিহাসিক মৈত্রীচুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন পুতিন ও জিনপিং।
২. জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণ ও ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ (Power of Siberia 2) গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে। মঙ্গোলিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৈরি হতে চলা এই পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে চিনে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হবে। যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে রাশিয়ার ভূয়সী প্রশংসা করে জিনপিং মস্কোকে চিনের ‘বিশ্বস্ত জ্বালানি সরবরাহকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
৩. পশ্চিমি সামরিক ও বাণিজ্যিক চাপের বিরুদ্ধে যৌথ অবস্থান
ইউক্রেন সংঘাত এবং পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির আবহে দুই দেশই পশ্চিমি দুনিয়ার বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার বার্তা দিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে সরাসরি আমেরিকা বা পশ্চিম ইউরোপের নাম না নিয়ে ‘সামরিক অভিযান’, ‘শাসন পরিবর্তন’ (Regime Change) এবং ‘আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে (Supply Chain) অযাচিত হস্তক্ষেপে’র তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।
৪. প্রযুক্তি, কৃত্রিম মেধা ও যৌথ গবেষণা
পশ্চিমি প্রযুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর থেকে পারস্পরিক নির্ভরতা কমাতে প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মেধাস্বত্ব এবং শিল্প খাতে একগুচ্ছ চুক্তি সই করেছে দুই দেশ। যৌথ বিবৃতিতে বৈদ্যুতিন সামগ্রী (Electronics) এবং কৃত্রিম মেধার (AI) ক্ষেত্রে যৌথ গবেষণা ও উৎপাদনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
৫. মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চিনের ভূমিকাকে পুতিনের স্বীকৃতি
যৌথ বিবৃতিতে ইরানসহ সামগ্রিকভাবে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বেজিং-এর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে জিনপিঙের ভূমিকাকে কার্যত প্রকাশ্য স্বীকৃতি দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

