রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেসের তথাকথিত ‘দুর্গ’। রবীন্দ্রকাব্যের উপমা টেনে স্বয়ং তৃণমূলের অন্দরের একাংশই এখন একে ‘নকল বুঁদির গড়’ বলে কটাক্ষ করতে শুরু করেছেন।
মঙ্গলবার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচন থেকে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী তথা বিদায়ী সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুগামী জাহাঙ্গির খান আচমকা সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করেছেন। এর ফলে এই আসনে বিজেপির জয় এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। নির্বাচন কমিশনের খাতায় ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা এবার পৌঁছতে চলেছে ২০৮-এ। গত ৪ মে রাজ্যের ২৯৩টি আসনের ভোটগণনায় ২০৭টি আসনে জিতেছিল বিজেপি (অনিয়মের অভিযোগে ফলতার গণনা স্থগিত ছিল)। কার্যক্ষেত্রে, নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর আসনটি ধরে রেখে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ায় বিজেপির আসন সংখ্যা বর্তমানে ২০৭ হলেও, ফলতার ফলাফল যুক্ত হলে কমিশনের নথিতে তা ২০৮ হবে। পরবর্তীতে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর (হুমায়ুন কবিরের ইস্তফায় খালি হওয়া) আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গিরের পিঠটান ও দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন
গত লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্র থেকে ৭ লক্ষ ১০ হাজারেরও বেশি ভোটের রেকর্ড ব্যবধানে জিতেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রেই তৃণমূলের ‘লিড’ ছিল ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৩৭২ ভোট। কিন্তু ক্ষমতা বদলের দু’বছরের মাথায় সেই ফলতাতেই বিনা যুদ্ধে বিজেপিকে ‘ওয়াক ওভার’ দিয়ে দিলেন তৃণমূলের একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা জাহাঙ্গির খান, যাঁর ইশারা ছাড়া এলাকায় গাছের পাতাও নড়ত না বলে রাজনৈতিক মহলে চর্চা রয়েছে।
মঙ্গলবার নিজের বাসভবনে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে ‘তৃণমূলের পুষ্পা’ বলে পরিচিত জাহাঙ্গির দাবি করেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতার জন্য যে বিশেষ উন্নয়ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, তার স্বার্থেই তিনি ভোটের ময়দান থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন যাতে এলাকার উন্নতি হয়। তবে দলের অন্দরের খবর, এই সিদ্ধান্তের আগে জাহাঙ্গির দলীয় নেতৃত্ব বিশেষত অভিষেকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। রাজ্য জুড়ে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশের ধরপাকড় শুরু হওয়ায় ‘টিম জাহাঙ্গির’-এর মধ্যে তৈরি হওয়া গভীর উদ্বেগের কারণেই এই আত্মসমর্পণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিষেকের ‘মডেল’ লক্ষ্য করে দলের অন্দরেই নজিরবিহীন বিদ্রোহ
ফলতার এই বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার তৃণমূল বিধায়কদের বৈঠকে নজিরবিহীন ক্ষোভের মুখে পড়েন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় বিধায়ক কুণাল ঘোষ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহারা সরাসরি জাহাঙ্গিরকে উপলক্ষ করে অভিষেককে নিশানা করেন এবং তাঁকে ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’ বলে কটাক্ষ করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে অভিষেককে এভাবে আক্রমণ করার ঘটনা তৃণমূলের ইতিহাসে কার্যত বিরল। পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার ওই তিন বিধায়ককে কালীঘাটে ডেকে যৌথভাবে বৈঠক করেছেন মমতা ও অভিষেক।
‘হীরক বন্দরে’ একের পর এক ভাঙনের চিত্র
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত ১২ বছর ধরে ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে ‘সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল সরকারি ক্ষমতা এবং পুলিশের একতরফা সমর্থন। ক্ষমতার অলিন্দ থেকে দল চ্যুত হতেই সেই মডেলের অসারতা প্রমাণ করে পর পর তিনটি বড় ধাক্কা এসেছে:
১. সাতগাছিয়ায় পরাজয়: ভোট গণনার দিনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে অভিষেকের দুর্গে থাবা বসিয়েছে বিজেপি। ডায়মন্ড হারবার লোকসভার অন্তর্গত সাতগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রটিতে তৃণমূলকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছে পদ্মশিবির। ২. বিধায়কের পলায়ন ও পুত্রের গ্রেফতারি: ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই পুলিশি মামলা এড়াতে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল। পুলিশ বিধায়ককে না পেয়ে তাঁর পুত্রকে নির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেফতার করেছে। ৩. ডায়মন্ড হারবারে ‘সৌজন্যের রাজনীতি’: একদা যে ডায়মন্ড হারবারে ২০১৯ সালে জেপি নড্ডার কনভয়ে পাথর ছোঁড়ার ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে গত শনিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠক চলাকালীন ফুলের তোড়া হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ডায়মন্ড হারবারের দু’বারের তৃণমূল বিধায়ক পান্নালাল হালদারকে। যদিও মুখ্যমন্ত্রীর সাথে তাঁর দেখা হয়নি, তবে এই ঘটনাকে নিছক ‘সৌজন্য’ হিসেবে দেখতে নারাজ রাজনৈতিক মহল।
পর্যবেক্ষণ: কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ— রাজ্য জুড়ে পরিবর্তনের যে হাওয়া বইছে, তা থেকে বাদ যায়নি ডায়মন্ড হারবারও। ক্ষমতার আসক্তি এবং প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা সরে যেতেই তথাকথিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ থেকে এক এক করে খসে পড়ছে হিরের টুকরোগুলো।

