রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণ ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু: নবান্নে ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণ ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু: নবান্নে ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করল রাজ্য সরকার। বুধবার নবান্নে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিক বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (CAA) আওতাভুক্ত নন এমন সমস্ত অবৈধ অভিবাসীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হবে। এরপর আইনি প্রক্রিয়া মেনে তাঁদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ-এর (BSF) হাতে তুলে দেওয়া হবে, যারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) দায়িত্ব পালন করবে।

শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগের সুরে জানান, কেন্দ্র সরকার এক বছর আগেই এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করলেও তৎকালীন ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকার তা কার্যকর করেনি। বর্তমান সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

নীতি ও কৌশল: ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’

রাজ্য প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ সহযোগিতায় এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘ডিটেক্ট (চিহ্নিত করা), ডিলিট (নাম মুছে দেওয়া) এবং ডিপোর্ট (ফেরত পাঠানো)’—এই ত্রিমুখী নীতিতে কাজ করবে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে জানানো হয়েছে, ভারত নীতিগতভাবে যে কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ বা ভিসার মেয়াদ শেষের পরও আইন বহির্ভূতভাবে দেশে থেকে যাওয়ার ঘোর বিরোধী। অবৈধ অভিবাসনের প্রভাব কেবল আইনশৃঙ্খলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর গভীর নিরাপত্তাজনিত এবং আর্থ-সামাজিক প্রভাব রয়েছে।

অবৈধ অভিবাসী কারা?

  • যে সমস্ত বিদেশি নাগরিক কোনো বৈধ পাসপোর্ট বা নথি ছাড়াই ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশ করেছেন।
  • যাঁরা বৈধ নথিপত্র নিয়ে ভারতে প্রবেশ করলেও, ভিসার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিজ দেশে ফিরে যাননি।

কেন্দ্রের গাইডলাইন অনুযায়ী, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা, গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ ও প্রত্যর্পণের সম্পূর্ণ ক্ষমতা রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশ এবং অভিবাসন ব্যুরোর (Bureau of Immigration) যুগ্ম ডিরেক্টরের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে।

প্রত্যর্পণ ও ডেটা সংগ্রহের বিশদ কার্যপ্রণালী

১. সীমান্তে ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ

বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীরা জলপথে বা স্থলপথে সীমান্ত পেরোনোর সময় ধরা পড়লে তাঁদের তৎক্ষণাৎ ফেরত পাঠানো হবে। তবে তার আগে বাধ্যতামূলকভাবে তাঁদের বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি) এবং জনতাত্ত্বিক (ডেমোগ্রাফিক) বিবরণ সংগ্রহ করতে হবে। এই তথ্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘ফরেনার্স আইডেন্টিফিকেশন পোর্টাল’ (FIP)-এ আপলোড করতে হবে। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে অফলাইনে তথ্য সংগ্রহ করে পরে তা দ্রুত পোর্টালে তুলতে হবে। এই সংক্রান্ত যাবতীয় মাসিক রিপোর্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে পাঠাবে সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী বাহিনী।

২. অনিচ্ছাকৃত অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে নিয়ম

কেউ ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত পার হলে বিএসএফ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তাঁরা নির্দোষ প্রমাণিত হলে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের পর বাংলাদেশ বা মায়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তবে সন্দেহজনক কিছু মিললে তাঁদের স্থানীয় রাজ্যের পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হবে।

অভ্যন্তরীণ এলাকায় অবৈধ বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে পদক্ষেপ

রাজ্যের অভ্যন্তরে বসবাসকারী অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কড়া প্রশাসনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে:

  • বিশেষ টাস্ক ফোর্স (STF): প্রতিটি জেলায় অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিতকরণের জন্য পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হবে।
  • হোল্ডিং সেন্টার বা শরণার্থী শিবির: অনুপ্রবেশকারীদের আটকে রাখা ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরি করবে রাজ্য সরকার।
  • নাগরিকত্বের দাবি যাচাই: কোনো ধৃত ব্যক্তি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক দাবি করলে, ৩০ দিনের মধ্যে তাঁর তথ্য যাচাই করা হবে। এই সময়কাল পর্যন্ত তিনি হোল্ডিং সেন্টারে থাকবেন। প্রমাণ না মিললে তাঁকে বহিষ্কার করা হবে।
  • ব্ল্যাকলিস্টিং ও প্রত্যর্পণ: রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি হিসেবে কেউ চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত হলে, বায়োমেট্রিক সংগ্রহের পর পুলিশের উপযুক্ত নিরাপত্তা ও নির্দেশের কাগজসহ তাঁকে বিএসএফ (বাংলাদেশ সীমান্তের জন্য) বা অসম রাইফেলস-এর (মায়ানমার সীমান্তের জন্য) হাতে তুলে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট অনুপ্রবেশকারীকে স্থায়ীভাবে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ করা হবে। জরুরি ভিত্তিতে হোল্ডিং সেন্টার থেকেও সরাসরি বিএসএফ তাঁদের সীমান্ত পার করে দিতে পারবে।

আন্তঃরাজ্য সমন্বয় ও কেন্দ্রীয় নজরদারি

ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে অনুপ্রবেশকারীদের স্থানান্তরের সময় সংশ্লিষ্ট সমস্ত রাজ্যের পুলিশকে পূর্বেই তথ্য জানাতে হবে। প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে রাজ্য সরকারকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে।

যাঁদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তাঁরা যাতে ভবিষ্যতে এ দেশে কোনো প্রকার পরিচয়পত্র (যেমন আধার বা ভোটার কার্ড) তৈরি করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করবে কেন্দ্র। এই তথ্য ইউআইডিএআই (UIDAI), নির্বাচন কমিশন ও বিদেশ মন্ত্রককে জানানো হবে। একই সাথে, ধৃতদের তথ্য বিদেশ মন্ত্রকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসে পাঠিয়ে নাগরিকত্ব যাচাই করা হবে।

খরচ ও অন্যান্য নির্দেশিকা

জেলা স্তরে শরণার্থী শিবির বা হোল্ডিং সেন্টার তৈরির যাবতীয় খরচ রাজ্য সরকার বহন করবে। তবে অনুপ্রবেশকারীদের আটক করা থেকে শুরু করে বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত প্রাথমিক খরচ রাজ্য বহন করলেও, পরবর্তীতে তা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে অনুদান হিসেবে ফেরত পাওয়া যাবে। এছাড়া, এই সংবেদনশীল বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রচার ও উত্তেজনা এড়ানোর জন্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.