ডিএ ও বেতন কমিশন নিয়ে আজই বড় সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা, নবান্নে দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে নজর রাজ্য সরকারি কর্মীদের

ডিএ ও বেতন কমিশন নিয়ে আজই বড় সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা, নবান্নে দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে নজর রাজ্য সরকারি কর্মীদের

রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর আজ, সোমবার নবান্নে ফের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও তাঁর নবগঠিত মন্ত্রিসভার সদস্যরা। নতুন সরকারের এটি দ্বিতীয় ক্যাবিনেট বৈঠক। রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের জ্বলন্ত সমস্যা ‘মহার্ঘভাতা’ (ডিএ) ও নতুন ‘বেতন কমিশন’ গঠন— আজকের এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হতে চলেছে। পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে ডিএ নিয়ে রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে কর্মী সংগঠনগুলির যে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলেছে, সেই প্রেক্ষাপটে আজ শুভেন্দুর মন্ত্রিসভা কর্মচারীদের মুখে হাসি ফোটাতে কোনো বড়সড় ঘোষণা করে কি না, সেদিকেই চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রয়েছেন গোটা রাজ্যের সরকারি কর্মীরা।


প্রথম বৈঠকের প্রতিশ্রুতি মেনে আজ দ্বিতীয় বৈঠক

রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর গত সোমবার নবান্নে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই বৈঠক শেষেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, পরবর্তী সোমবার (আজ) ফের বৈঠকে বসবে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, দ্বিতীয় বৈঠকের মূল এজেন্ডা বা তালিকায় থাকবে সরকারি কর্মীদের বকেয়া মহার্ঘভাতা (DA) মিটিয়ে দেওয়া এবং নতুন বেতন কমিশনের রূপরেখা তৈরি করা।


১২ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির আর্জি শিক্ষক ও কর্মী সংগঠনের

আজকের ক্যাবিনেট বৈঠকের ঠিক মুখে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে একটি বিশেষ ইমেল পাঠিয়েছে ‘বেঙ্গল টিচার্স অ্যান্ড এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন’। ওই শিক্ষক ও কর্মী সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, বর্তমানে এ রাজ্যের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা মাত্র ১৮ শতাংশ হারে ডিএ পাচ্ছেন, যা কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ কম।

সংগঠনের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আর্জি জানানো হয়েছে:

“আজকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকেই যেন রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ একলাফে অন্তত ১২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে রাজ্যের ডিএ-র হার ৩০ শতাংশে পৌঁছাবে, যা কেন্দ্রীয় হারের সঙ্গে ব্যবধান কিছুটা হলেও কমাতে সাহায্য করবে।”


সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশ ও পূর্বতন সরকারের ‘টালবাহানা’

রাজ্য সরকারি কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘভাতা এবং বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করছেন। এই দাবিতে পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই লড়েছেন তাঁরা। প্রতিবারই আদালত কর্মচারীদের পক্ষেই রায় দিয়েছে।

চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া ডিএ মামলার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বকেয়া ডিএ-র ক্ষেত্রে এই নির্দেশ প্রযোজ্য ছিল। সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল:

  • মোট বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ অবিলম্বে রাজ্য সরকারি কর্মীদের মিটিয়ে দিতে হবে।
  • বাকি ৭৫ শতাংশ বকেয়া টাকা কত কিস্তিতে এবং কীভাবে দেওয়া হবে, তা ৬ মার্চের মধ্যে কমিটিকে জানাতে হবে এবং প্রথম কিস্তির টাকা ৩১ মার্চের মধ্যে কর্মচারীদের অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে।

তবে সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া নির্দেশের পরও তৎকালীন তৃণমূল সরকার কোষাগারের সংকটের অজুহাত দেখিয়ে বকেয়া মেটানোর সময়সীমা বৃদ্ধির আর্জি জানিয়ে পুনরায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল।


বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা বনাম অধরা প্রাপ্তি

লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক প্রাক্কালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রোপা-২০০৯ (ROPA-2009) অনুযায়ী বকেয়া ডিএ ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে দেওয়ার কথা সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, মার্চ মাস পেরিয়ে নতুন মে মাস চলে এলেও কোনো টাকা তাঁরা পাননি। কর্মচারীদের একাংশের দাবি, তাঁদের বলা হয়েছিল বকেয়া ডিএ-র একটি অংশ সরাসরি প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF) অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে, কিন্তু বাস্তবে এখনও পর্যন্ত প্রভিডেন্ট ফান্ডে কোনো টাকা জমা পড়েনি।

নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকেই বিজেপি নেতৃত্ব রাজ্যে সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেওয়ার এবং কেন্দ্রীয় হারের সমকক্ষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল। ফলে রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠার পর আজ সোমবারের ক্যাবিনেট বৈঠকের পর নবান্ন থেকে কী সুখবর আসে, তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন লক্ষ লক্ষ রাজ্য সরকারি কর্মী ও শিক্ষক শিক্ষিকারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.