আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্তে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই (CBI)-এর প্রধান তদন্তকারী অফিসার সীমা পাহুজাকে এবার সরাসরি কাঠগড়ায় তুললেন তমলুকের বিজেপি সাংসদ তথা কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। শনিবার দুপুরে আরজি কর হাসপাতালে দাঁড়িয়ে তিনি বিস্ফোরক দাবি করেন যে, মামলার তদন্তকারী আধিকারিক সীমা পাহুজা তথ্যপ্রমাণ লোপাটে সরাসরি সাহায্য করেছেন। তাঁকে অবিলম্বে এই মামলায় ‘অভিযুক্ত’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে তদন্তের আওতায় আনা উচিত।
এদিন দুপুরে চিকিৎসকদের বিশেষ পোশাক ‘অ্যাপ্রন’ পরে হঠাৎই আরজি কর হাসপাতালে পরিদর্শনে যান প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। সেখানে ঘুরে দেখার পাশাপাশি সামগ্রিক সিবিআই তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশংসা ও একাধিক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন— দুই-ই ছুড়ে দেন তিনি।
সিল করা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তদন্তের ‘গাফিলতি’র খতিয়ান
হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় সোজা চলে যান ২০২৪ সালের অগস্টে নির্যাতিতা চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হওয়া সেই চারতলার সেমিনার হলের সামনে, যা বর্তমানে সিবিআই-এর তরফে সিল করে রাখা হয়েছে। সেই বন্ধ ঘরের সামনে দাঁড়িয়েই সিবিআই অফিসার সীমার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি।
সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মূল অভিযোগগুলি হলো:
- তথ্যপ্রমাণ উপেক্ষার অভিযোগ: সিবিআই-এর সিল করা ওই ঘরের ভেতরে এখনও তদন্তের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্যপ্রমাণ রয়ে গেছে, যা সিবিআই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংগ্রহ বা খতিয়ে দেখেনি।
- সীমার অঙ্গুলিহেলন: সিবিআই তদন্তে এ যাবৎ যে সমস্ত বড়সড় গাফিলতি ও ফাঁকফোকর থেকে গেছে, তা তদন্তকারী অফিসার সীমা পাহুজার ‘অঙ্গুলিহেলনেই’ হয়েছে। সীমা নিজের দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।
রহস্যময় সিঁড়ি ও নার্সের ভিডিও ডিলিট করার চাঞ্চল্যকর দাবি
সেমিনার হলের পাশাপাশি হাসপাতালের একটি নির্দিষ্ট সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে দেখা যায় প্রাক্তন বিচারপতিকে। সেই সিঁড়িটি দেখিয়ে তিনি এক নতুন রহস্যের অবতারণা করেন। অভিজিৎবাবুর দাবি, ঘটনার দিন বা তারপরে ওই সিঁড়ি দিয়ে ভারী কোনো কিছু নিচে নামানো হয়েছিল— যা সম্ভবত নির্যাতিতার দেহও হতে পারে। অথচ, সিবিআই এই গুরুত্বপূর্ণ সিঁড়িটিকে তাদের তদন্তের পরিধির মধ্যেই আনেনি।
এর চেয়েও বড় চমকপ্রদ দাবি করে বিজেপি সাংসদ জানান, ঘটনার পরপরই হাসপাতালের এক নার্স নিজের মোবাইলে একটি ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন। তদন্তভার নেওয়ার পর সিবিআই অফিসার সীমা পাহুজা ওই নার্সের কাছ থেকে ভিডিওটি সংগ্রহ করেন এবং পরে প্রমাণ নষ্টের উদ্দেশ্যে সেই নার্সকে মোবাইল থেকে ভিডিওটি স্থায়ীভাবে মুছে ফেলার (Delete) নির্দেশ দেন। অভিজিতের অভিযোগ, সিবিআই এই ভিডিওটিকে মামলার তদন্তে বা আদালতে শুনানির সময়ে কোনো গুরুত্বই দেয়নি, এমনকি এর অস্তিত্বের কথাও কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।
নির্যাতিতার পরিবারের ক্ষোভ ও আদালতের উত্তাপ
আরজি কর কাণ্ডে সিবিআই-এর এই দুঁদে নারী অফিসারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবারই প্রথম নয়। কলকাতা পুলিশের হাত থেকে হাইকোর্টের নির্দেশে মামলা সিবিআই-এর কাছে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন কেটে গেলেও নতুন করে কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় নির্যাতিতার মা-বাবাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
সম্প্রতি শিয়ালদহ আদালতে মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়ের সাজা ঘোষণার পর আদালত চত্বরেই সীমা পাহুজার ওপর ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন নির্যাতিতার বাবা। তিনি সীমার দিকে আঙুল উঁচিয়ে তেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁকে ‘শয়তান’ বলেও সম্বোধন করেছিলেন। এবার খোদ দেশের শাসকদলের সাংসদ তথা প্রাক্তন বিচারপতি সিবিআই অফিসারের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ লোপাটের মতো মারাত্মক অভিযোগ তোলায় আরজি করের আইনি লড়াই এক নজিরবিহীন মোড় নিল বলে মনে করছে আইন ও রাজনৈতিক মহল।

