দক্ষিণ ২৪ পরগনার হাই-ভোল্টেজ ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের বাকি আর মাত্র পাঁচ দিন। আগামী ২১ মে এই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ। তার আগে শনিবার ফলতায় বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডার সমর্থনে এক নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিয়ে তীব্র রাজনৈতিক পারদ চড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সভা থেকে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ তথা ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানকে ‘কুখ্যাত অপরাধী’ ও ‘ডাকাত’ আখ্যা দিয়ে চরম হুঁশিয়ারি দেন তিনি। শুভেন্দু স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘ভোট শেষ হোক। ওর ব্যবস্থা করব। সেই দায়িত্ব আমার।’’
বিগত কয়েক বছরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক সমীকরণে অভিষেক-ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গির খান অন্যতম প্রভাবশালী নাম হয়ে উঠেছেন। সাধারণ নির্বাচনের সময় ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পর্যবেক্ষক তথা উত্তরপ্রদেশের ‘এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট’ আইপিএস অফিসার অজয়পাল শর্মার সঙ্গে তাঁর ঠান্ডা লড়াই রাজ্য রাজনীতিতে চর্চার বিষয় ছিল। যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যের ‘সিংহম’ হিসেবে পরিচিত অজয়পালের উদ্দেশে জাহাঙ্গির হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, ‘‘উনি সিংহম হলেও আমিও পুষ্পা… ঝুঁকেগা নহি।’’
“সাদা থান পড়তে দেব না, গুন্ডামি বন্ধ হবে”
শনিবার ফলতার সভা থেকে জাহাঙ্গিরের সেই ‘পুষ্পা’ সংলাপকে তীব্র কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (NHRC) রিপোর্টের সূত্র টেনে তিনি বলেন, ‘‘২০২১ সালে ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনায় ১৯ জনকে ‘নটোরিয়াস ক্রিমিনাল’ (কুখ্যাত অপরাধী) ঘোষণা করেছিল মানবাধিকার কমিশন। তার মধ্যে জাহাঙ্গির একজন। ওই ডাকাতটা কোথায়, পুষ্পা না কী যেন নাম! সাধারণ নির্বাচনের সময় ও যত অত্যাচার করেছে, সবগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা হবে। গুন্ডামি করতে দেব না, নিশ্চিন্ত থাকুন। এবার আর কারও বাড়িতে সাদা থান পড়তে দেব না।’’
উল্লেখ্য, বিজেপি যখন বিরোধী আসনে ছিল, তখন থেকেই তাদের অভিযোগ ছিল যে ফলতা এবং সমগ্র ডায়মন্ড হারবার লোকসভা এলাকায় জাহাঙ্গিরের নেতৃত্বেই দেদার সন্ত্রাস, তোলাবাজি এবং বুথ দখলের ঘটনা ঘটেছে। তাঁর দাপটে বহু বিরোধী কর্মী ও সাধারণ মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন বলেও অভিযোগ পদ্মশিবিরের। তবে সমস্ত অভিযোগ নস্যাৎ করেছেন জাহাঙ্গির খান। সাধারণ নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল প্রার্থীকে ফলতা থেকে দেড় লক্ষের বেশি ভোটের লিড এনে দেওয়া এই নেতা শুক্রবার দলীয় কার্যালয় খুলে জানান, তিনি ভোটের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং ফলতার উন্নয়নই তাঁর হয়ে জবাব দেবে।
১ লক্ষ ভোটের ব্যবধানে জেতানোর আবেদন ও ‘স্পেশ্যাল প্যাকেজ’
সাধারণ নির্বাচনের দিন ফলতার বেশ কয়েকটি বুথে কারচুপির অভিযোগে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। এই পুনর্নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার আশ্বাস দিয়ে ফলতাবাসীর জন্য একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে এই এলাকার মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এবার কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারবেন নাগরিকরা।
ফলতার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি ‘স্পেশ্যাল ডেভেলপমেন্ট প্যাকেজ’ (বিশেষ উন্নয়ন প্যাকেজ)-এর ঘোষণা করে শুভেন্দু বলেন:
‘‘এই পুনর্নির্বাচন নিছক কোনো বিধানসভার সাধারণ ভোট নয়, এটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। এই কেন্দ্রের ২ লক্ষ ২৫ হাজার ভোটারের কাছে আমার আবেদন, আপনারা বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডাকে অন্তত এক লক্ষ ভোটের ব্যবধানে জিতিয়ে নবান্নে পাঠান।’’
পুলিশকে ‘ফ্রি-হ্যান্ড’ ও দলদাসত্ব মুক্তির বার্তা
রাজ্যের পুলিশমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা শুভেন্দু অধিকারী এদিন ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার আধিকারিকদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন। পূর্বতন তৃণমূল সরকার ও সাংসদ অভিষেকের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘বিগত বছরগুলিতে ডায়মন্ড হারবার এলাকায় প্রচুর বেআইনি কাজ হয়েছে। রাজনৈতিক চাপে পড়ে আপনাদেরই সেই সব সমাজবিরোধী কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। এখানকার বিদায়ী সাংসদ নিজে ফোন করে করে পুলিশকে দিয়ে দলদাসের মতো কাজ করাতেন, তার সব তথ্য ও প্রমাণ আমার টেবিলে রয়েছে। কিন্তু সেই দিন এবার শেষ। এখন থেকে পুলিশকে আমি সম্পূর্ণ ‘ফ্রি-হ্যান্ড’ (স্বাধীন ক্ষমতা) দিলাম। কোনো রাজনৈতিক তাঁবেদারি না করে নিরপেক্ষভাবে আইনের শাসন কায়েম করুন।’’

