ডায়মন্ড হারবারে প্রথম জেলা সফরেই বিস্ফোরণ: আরজি কর ও ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস’ নিয়ে মমতা-অভিষেককে চরম হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

ডায়মন্ড হারবারে প্রথম জেলা সফরেই বিস্ফোরণ: আরজি কর ও ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস’ নিয়ে মমতা-অভিষেককে চরম হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

আরজি কর কাণ্ড এবং নিয়োগ দুর্নীতি— দুই ‘কাণ্ডেরই’ শেষ দেখে ছাড়বেন বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে নিজের প্রথম জেলা সফরে এসে পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার ও তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে একযোগে তীব্র নিশানা করেন তিনি। শুভেন্দুর স্পষ্ট অভিযোগ, আরজি করে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় মূল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করেছিল বিদায়ী সরকার। অন্যদিকে, ক্ষমতায় থাকার সুবাদে সাংসদ অভিষেকের হিসাব-বহির্ভূত সম্পত্তি বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আগামী ২১ মে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচন উপলক্ষে শনিবার দলীয় সভায় যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী। তার আগে ডায়মন্ড হারবারে পুলিশকর্তাদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সারেন তিনি। ওই বৈঠক থেকেই শুভেন্দু ঘোষণা করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে তৈরি হওয়া ‘পুলিশ ওয়েলফেয়ার বোর্ড’ শনিবার থেকেই স্থায়ীভাবে ভেঙে দেওয়া হলো।


“সাসপেন্ড হওয়া আইপিএসদের কল রেকর্ডেই লুকিয়ে আগের সরকারের কুকীর্তি”

শুক্রবারই আরজি কর কাণ্ডে কর্তব্যে গাফিলতি ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন কমিশনার বিনীত গোয়েলসহ ৩ শীর্ষ আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করেছে নতুন সরকার। এদিন ফলতার জনসভা থেকে সেই প্রসঙ্গ টেনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে তীব্র আক্রমণ করেন শুভেন্দু।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন:

“অভয়ার ঘটনায় আগের মুখ্যমন্ত্রীর ইশারায় এবং কথায় যাঁরা যাঁরা অত্যাচার করেছেন, প্রমাণ লোপাট করেছেন এবং অভয়ার মাকে ঘুষ দিতে গিয়েছিলেন, সেই তিন আইপিএস সাসপেন্ড হয়েছেন। বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, অভিষেক গুপ্তদের কল রেকর্ড আর হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট যখন তদন্তকারীদের সামনে আসবে, সেদিন দেখতে পাবেন আগের সরকারের কুকীর্তি! এরা কত নিচে নেমেছিল!”

তিনি আরও জানান, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাতেও অত্যাচারী পুলিশ অফিসারদের রেয়াত করা হবে না। বিজেপি প্রার্থী ও কর্মীদের ওপর অত্যাচারের দায়ে ইতিমধ্যেই বারুইপুর ও ক্যানিংয়ের আইসি-দের সাসপেন্ড করা হয়েছে। ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার সমস্ত অফিসারের কল রেকর্ড ও চ্যাট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘ভাইপো’র পিএ-র নির্দেশে কারা কারা এই জেলায় অত্যাচার চালিয়েছিল, তা সব বের করা হবে বলে জানান তিনি।


‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস’-এর ২৪টি সম্পত্তির তালিকা নবান্নে, তদন্তের হুঁশিয়ারি

নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় বারবার আলোচনায় আসা ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংস্থা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তি নিয়ে এদিন বড়সড় আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী। নাম না-করে অভিষেককে উদ্দেশ্য করে শুভেন্দু বলেন:

“মাননীয় ভাইপোবাবু, কালই কলকাতা কর্পোরেশন থেকে আপনার প্রপার্টির লিস্ট আনিয়েছি। কলকাতায় আপনার ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস’-এর ২৪টি সম্পত্তি রয়েছে। আমতলায় রয়েছে প্রাসাদের মতো অফিস। সবকিছুর হিসাব হবে।”

উল্লেখ্য, ইডি (ED) ইতিপূর্বেই আদালতে অভিযোগ করেছে যে, ওই সংস্থার মাধ্যমে নিয়োগ দুর্নীতির কোটি কোটি টাকা লেনদেন বা সাদা করা হয়েছে, যদিও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার এই অভিযোগ নস্যাৎ করেছেন।


“এটা বাংলার দ্বিতীয় স্বাধীনতা, ফলতায় এবার ভোট হবে”

ফলতার তৃণমূল প্রার্থী তথা অভিষেক-ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গির খানকে ‘কুখ্যাত অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনায় যে ১৯ জনকে কুখ্যাত অপরাধী বলেছিল, জাহাঙ্গির তার অন্যতম। বিগত ১০ বছর ফলতার মানুষ লোকসভা, বিধানসভা বা পঞ্চায়েতে ভোট দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করে শুভেন্দু বলেন, “ভোট মিটলেই জাহাঙ্গিরের ‘ব্যবস্থা’ করার দায়িত্ব আমি নিচ্ছি।”

তৃণমূল জমানার রাজনৈতিক হিংসার কথা স্মরণ করে শ্লেষের সুরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “পৃথিবীটা গোল। চিরদিন কারও সমান যায় না। ২০২৩ সালে আমার সভায় আসা লোকগুলোকে পুলিশ দিয়ে যেভাবে মার খাইয়েছিলেন, আমি ভুলিনি। মানুষ আমাদের শুধু চেয়ারে বসায়নি, বিচার চেয়েছে। এটা শুধু নামের বা রঙের বদল নয়, এটা বাংলার দ্বিতীয় স্বাধীনতা।”

তিনি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন, বিগত ৫ বছর বা তারও আগে সাধারণ মানুষের ওপর যত অত্যাচার হয়েছে, তার সব অভিযোগ নিয়ে এফআইআর (FIR) দায়ের করতে হবে। একই সঙ্গে আমফান, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, কৃষকবন্ধু বা ১০০ দিনের কাজের টাকা যারা কাটমানি বা ঘুষ হিসেবে খেয়েছে, সেই সব ‘পঞ্চুবাবু’দের জেলে ঢোকানোর নির্দেশ দেন তিনি।


‘মনগড়া উইশলিস্ট পূরণ’, ড্যামেজ কন্ট্রোলে কুণাল ঘোষ

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই অল-আউট আক্রমণের পর তৃণমূলের পক্ষে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামেন বিধায়ক তথা মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। আরজি কর প্রসঙ্গে শুভেন্দুর পদক্ষেপকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “আরজি করের ঘটনায় পুলিশ যাকে গ্রেফতার করেছিল, সিবিআই তাকে ছাড়া আর কাউকে পায়নি। এখন নতুন সরকার পুলিশকে সাসপেন্ড করেছে। আরজি করের সময় যে সব মনগড়া কথা বা রটনা উড়ছিল, সেই ‘উইশলিস্ট’ পূরণ করতেই কি এই সস্তা পদক্ষেপ করা হচ্ছে?”

অন্যদিকে, অভিষেকের সম্পত্তি ও ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস’ বিতর্ক থেকে দলকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে কুণাল বলেন, “লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস সংস্থার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। তাই দলের মুখপাত্র হিসেবে এ নিয়ে কোনো বিবৃতি আমি দেব না। ওই সংস্থা বা সংস্থার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই আইনি স্তরে যা বলার বলবেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.