বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে কোন্দল এবার চরমে পৌঁছল। উত্তর কলকাতা জেলা তৃণমূলের ‘অফিসিয়াল’ হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপে সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে দলেরই কাউন্সিলরের বেনজির আক্রমণ এবং পাল্টা ‘কুকথার’ বন্যা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। সমাজমাধ্যমে ফাঁস হওয়া চ্যাটের স্ক্রিনশট (যার সত্যতা যাচাই করেনি সংবাদমাধ্যম) ঘিরে অস্বস্তিতে ঘাসফুল শিবির।
‘অঘোষিত সম্রাট’ কটাক্ষ ও বাদানুবাদ
ঘটনার সূত্রপাত ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মেসেজ ঘিরে। নির্বাচনে দলের হারের পর ঘরছাড়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি সরাসরি সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন। সুব্রতবাবু লেখেন:
“আপনি উত্তর কলকাতার অঘোষিত সম্রাট। আপনার তো উচিত ঘরছাড়াদের ঘরে ঢোকানো। সেই জায়গায় আপনি তো নিজেই ঘরে ঢুকে আছেন। অনেক দিন ধরে পদ আঁকড়ে বসে আছেন। অনেক হয়েছে, এ বার ছাড়ুন।”
এই বার্তার পরই গ্রুপে সুদীপ-ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলররা সুব্রতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুনন্দা সরকার পাল্টা প্রাক্তন মন্ত্রী শশী পাঁজার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বাদানুবাদ চলাকালীন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং আসরে নামেন। তিনি সুনন্দাকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, “হাতি চলে বাজার, কুত্তা ভোকে হাজার। জবাব দিও না। আমি দিয়ে দেব।”
সাংসদের ‘কুত্তা’ সম্বোধনে ক্ষুব্ধ কাউন্সিলর সুব্রত পাল্টা লেখেন, তিনি দলের সৈনিক, ‘কুত্তা’ নন। তিনি কেবল সাংসদের সুস্বাস্থ্য কামনা করেছেন।
দলের অভ্যন্তরে বাড়ছে ক্ষোভ
নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপি ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করার পর তৃণমূলের অভ্যন্তরে এই বিদ্রোহ নতুন নয়। তবে উত্তর কলকাতায় এই কোন্দল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দলের একাংশের অভিযোগ:
- নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর শীর্ষ নেতৃত্ব কর্মীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না।
- দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ বন্টনে ‘পরিবারতন্ত্র’ ও ‘প্রভাব’ কাজ করছে।
- সাংসদ-পত্নী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় উপদলনেতা করার নেপথ্যে সুদীপের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিক্ষুব্ধরা।
নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া
এই কদর্য ভাষা যুদ্ধ নিয়ে উত্তর কলকাতা জেলা তৃণমূলের কোর কমিটির সদস্য স্বপন সমাদ্দার বলেন, “হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপে কী হয়েছে তা আমি জানি না। তবে যদি সাংসদের সঙ্গে কাউন্সিলরদের মতপার্থক্য হয়েও থাকে, তবে যে ধরনের ভাষা ব্যবহারের কথা শুনছি, তা কাম্য নয়।”
সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বা কাউন্সিলর সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সুনন্দা সরকার চ্যাটের বিষয়টি অস্বীকার না করলেও সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে চাননি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসনে জয়লাভ করে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে। একদিকে যখন বিজেপি সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক রদবদল শুরু করেছে, ঠিক তখনই প্রধান বিরোধী দলের অন্দরে এই ‘গৃহযুদ্ধ’ দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। কুণাল ঘোষের সঙ্গে সুদীপের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের পর এবার কাউন্সিলরদের এই বিদ্রোহ উত্তর কলকাতায় তৃণমূলের সংগঠনকে আরও দুর্বল করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

