সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের কবজ কবজ এবং ‘বাঙালি বিরোধী’ তকমার প্রচার সত্ত্বেও কেন ধসে গেল তৃণমূলের সাজানো দুর্গ? কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে ইতি টেনে বাংলায় ফুটল পদ্ম? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে আটটি প্রধান কারণ।
১. তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া (Anti-Incumbency)
একটানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনমানসে স্বাভাবিক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে নিচুতলার নেতাদের ‘সিন্ডিকেট’ রাজ, নেতাদের অস্বাভাবিক সম্পত্তি বৃদ্ধি এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বণ্টনে বৈষম্য সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ২০২১ সালের জয়ের পর এই অসন্তোষ নিরসনের সুযোগ থাকলেও শাসকদল তা করেনি, যা এবার ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. দুর্নীতির পাহাড় ও ভাবমূর্তিতে ধাক্কা
চিটফান্ড থেকে শুরু করে নারদা, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ, রেশন, কয়লা ও গরু পাচারের মতো একের পর এক দুর্নীতি তৃণমূলের ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকার ছবি মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলেছিল। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের মতো হেভিওয়েট মন্ত্রীদের জেলযাত্রা প্রমাণ করেছে যে দুর্নীতি শুধু অভিযোগ নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা।
৩. এসআইআর (SIR): ভুতুড়ে ভোটারের অবসান
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) তৃণমূলের ভোটযন্ত্রকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ ভুয়ো, মৃত এবং স্থানান্তরিত নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর ফলে ‘ভুতুড়ে ভোটার’ বা ছাপ্পা ভোটের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া, নথি সংক্রান্ত সমস্যায় সংখ্যালঘু ভোটের একটি অংশও তালিকা থেকে বাদ পড়ায় তৃণমূলের ‘বাঁধা ভোটব্যাঙ্কে’ টান পড়ে।
৪. তোষণের অভিযোগ ও হিন্দু ভোটের একীকরণ
বিজেপি লাগাতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক তোষণের অভিযোগ তুলেছিল। গত পাঁচ বছরে রাজ্যে ঘটা সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা এবং বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হিন্দু নির্যাতনের প্রভাব বাংলায় পড়েছিল। আরএসএস ও বিজেপির প্রচার— “তৃণমূল থাকলে পশ্চিমবঙ্গও বাংলাদেশ হবে”— সংখ্যাগুরু ভোটারদের বড় অংশকে বিজেপির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
৫. প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো
নির্বাচন কমিশনের সুকৌশলী পদক্ষেপে নির্বাচনের অনেক আগেই রাজ্য প্রশাসনের ওপর থেকে তৃণমূলের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ আলগা হতে শুরু করে। কমিশন রাতারাতি মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব থেকে শুরু করে নিচুতলার আইসি-ওসি পর্যন্ত রদবদল করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, খোদ মুখ্যমন্ত্রী আক্ষেপ করেছিলেন ডিজি তাঁর ফোন ধরছেন না। পুলিশ ও প্রশাসন ‘নিরপেক্ষ’ হয়ে যাওয়ায় তৃণমূলের সাংগঠনিক পেশ পেশি শক্তি কাজে আসেনি।
৬. কেন্দ্রীয় বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও ভয়মুক্তি
ভোটের অনেক আগে থেকেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে রুট মার্চ শুরু করায় ‘সন্ত্রাস’-এর আবহ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। রাস্তায় সাঁজোয়া গাড়ির দাপট এবং বাহিনীর রুদ্রমূর্তি তৃণমূল কর্মীদের কোণঠাসা করে দেয়। সাধারণ ভোটাররা বাহিনীকে পাশে পেয়ে নির্ভয়ে বুথে পৌঁছেছেন, যা তৃণমূলের ভোট ম্যানেজারদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে।
৭. দু’দফায় শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণ
আগে যেখানে ৭-৮ দফায় ভোট হতো, এবার মাত্র দু’দফায় ভোট নিয়ে কমিশন বড় ঝুঁকি নিয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে কোনও প্রাণহানি বা গুরুতর হিংসা ছাড়াই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ছাপ্পা ভোট বা বুথ জ্যামের চিরাচরিত সংস্কৃতি বন্ধ হওয়ায় বিরোধীদের আসল ভোটবাক্স ভর্তি হয়েছে।
৮. আই-প্যাক (I-PAC) কাণ্ড ও সাংগঠনিক বিপর্যয়
তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাকের ওপর দলের অতি-নির্ভরশীলতাই তাদের কাল হল। ভোটের মুখে ইডির হানায় আই-প্যাকের ডিরেক্টর বিনেশ চান্দেল গ্রেফতার হওয়ায় সংস্থাটি তাদের কাজ বন্ধ করে দেয়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবর্তিত ‘কর্পোরেট সংস্কৃতি’র মেরুদণ্ড ছিল আই-প্যাক। সংস্থাটি সরে দাঁড়ানোয় ৪১ হাজার কর্মীর নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে এবং দলের পুরোনো নেতারাও ততদিনে তাঁদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই শূন্যতাই বিজেপিকে এগিয়ে যাওয়ার সহজ পথ করে দেয়।

