সমস্ত জল্পনা ও রাজনৈতিক তর্কের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করতে চলেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। লোকসভা নির্বাচনের সামান্য ব্যবধান ঘুচিয়ে মাত্র দু’বছরের মধ্যেই ২০০-র গণ্ডি পার করে রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার গঠন নিশ্চিত করল পদ্ম শিবির। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে জেলা থেকে শহর— সর্বত্রই আছড়ে পড়েছে গেরুয়া ঝড়। এমনকি, খাস কলকাতার শাসকদলের দুর্ভেদ্য গড়গুলিতেও ফাটল ধরিয়েছে বিজেপি।
এসআইআর: তৃণমূলের হাতিয়ার বনাম বিজেপির ছাঁকনি
এবারের নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সবথেকে বড় ভূমিকা নিয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)। তৃণমূল কংগ্রেস এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং অনুপ্রবেশকারী তকমা দিয়ে যোগ্য ভোটারদের অধিকার হরণের চক্রান্ত হিসেবে প্রচারের মূল হাতিয়ার করেছিল। অন্যদিকে, বিজেপির দাবি ছিল স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য এই ‘শুদ্ধিকরণ’ অপরিহার্য। গণনার ফলাফল বলছে, মানুষ তৃণমূলের অভিযোগের চেয়ে বিজেপির ‘স্বচ্ছ তালিকা’র তত্ত্বেই বেশি আস্থা রেখেছেন।
এসআইআর-এর পরিসংখ্যান এক নজরে:
- প্রক্রিয়ার শুরু: ৪ নভেম্বর ২০২৫।
- প্রাথমিক ভোটার: ৭.৬৬ কোটি।
- খসড়া তালিকায় নাম বাদ: ৫৮ লক্ষেরও বেশি (মৃত, নিরুদ্দেশ ও স্থানান্তরিত)।
- চূড়ান্ত তালিকা (২৮ ফেব্রুয়ারি): আরও ৫.৪৬ লক্ষ নাম বাদ দিয়ে যোগ্য ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৬.৪৪ কোটি।
- বিবেচনাধীন তালিকা: প্রায় ৬০ লক্ষ নাম ঝুলে ছিল, যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টের বিশেষ হস্তক্ষেপে বিচার বিভাগীয় নজরদারিতে শুনানি হয়।
রেকর্ড ভোটদান: প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার প্রবল হাওয়া
রাজ্যে এবার মোট ভোটারের সংখ্যা আগের চেয়ে কমলেও ভোটদাতার সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। দু’দফা মিলিয়ে প্রায় ৯৩ শতাংশ ভোটদান হয়েছে, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক সর্বকালীন রেকর্ড।
- ভোটার বনাম ভোটদান: গতবারের তুলনায় ভোটার কমেছে ৫১ লক্ষ, কিন্তু ভোট পড়েছে ৩১ লক্ষ বেশি।
- বিশ্লেষণ: প্রতি বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে ১০ হাজার অতিরিক্ত ভোট পড়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক ‘নতুন’ বা ‘এতদিন ভোট না দেওয়া’ মানুষের বুথমুখী হওয়া সরাসরি প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার ইঙ্গিত দিয়েছে।
আদালত ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
এসআইআর নিয়ে টানাপোড়েনের সময় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত ট্রাইব্যুনালে নাম তোলার জন্য কয়েক লক্ষ মানুষ আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৫০০-র কম মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পান। তৃণমূল, সিপিএম ও কংগ্রেস এই বিষয়টিকেই ‘হয়রানি’ হিসেবে প্রচারে এনেছিল। কিন্তু ভোটারদের একাংশের মতে, স্বচ্ছ তালিকার মাধ্যমে নির্বাচনে কারচুপি রোখার যে বার্তা বিজেপি দিয়েছিল, তা সাধারণ মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
ফলাফলের তাৎপর্য: কেন হারল তৃণমূল?
১. এসআইআর কার্ড ব্যর্থ: যে হয়রানিকে তৃণমূল আবেগীয় ইস্যু করতে চেয়েছিল, মানুষ তাকে প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে গ্রহণ করেছে। ২. পরিযায়ী শ্রমিকদের ভূমিকা: নাম বাদ পড়ার ভয়ে ভিন রাজ্য থেকে রেকর্ড সংখ্যায় শ্রমিকরা ভোট দিতে ফেরেন, যা শেষ পর্যন্ত শাসকদলের বিরুদ্ধে গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ৩. পরিবর্তনের মেজাজ: ২০১১ সালের মতোই বিপুল ভোটদানের হার পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে, যেখানে ১৫ বছরের ক্ষোভ এসআইআর-এর সমস্যাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই জয় কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন। ‘অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ’ জয়ের যে ডাক প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন, বাংলার এই ভূমিধস বিজয় তাকেই পূর্ণতা দিল।

