আই-প্যাক কাণ্ডে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি: সিবিআই তদন্তের আর্জি ইডির, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে সরব আদালত

আই-প্যাক কাণ্ডে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি: সিবিআই তদন্তের আর্জি ইডির, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে সরব আদালত

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা সৃষ্টি এবং সরকারি আধিকারিকদের অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে আই-প্যাক (I-PAC) সংক্রান্ত ঘটনায় সিবিআই তদন্তের আর্জি জানাল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র এবং বিচারপতি এনভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। উভয় পক্ষের তীব্র সওয়াল-জওয়াবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এজলাস।

ইডি-র মূল অভিযোগ: এদিন ইডি-র আইনজীবী তুষার মেহতা ও এসভি রাজু আদালতে দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন বিপন্ন। তাঁদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিজিপি এবং পুলিশ কমিশনারকে সঙ্গে নিয়ে ইডি-র তল্লাশি অভিযানে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করেছেন। ইডি-র অভিযোগের প্রধান দিকগুলি হলো:

  • তদন্তে বাধা: তল্লাশি চলাকালীন উদ্ধার করা নথিপত্র জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
  • প্রশাসনের অপব্যবহার: ডিজিপি এবং পুলিশ কমিশনারকে মুখ্যমন্ত্রীর ‘ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
  • একতরফা এফআইআর: ইডি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল নেত্রী হিসেবে এফআইআর করেছেন, যা নিরপেক্ষ তদন্তের পরিপন্থী। ইডি-র দাবি, এফআইআর করার অধিকার থাকলেও, সেই তদন্ত নিজ অধীনে থাকা আধিকারিকদের দিয়ে করানো যায় না।
  • অতীতের উদাহরণ: সিবিআই দফতরের বাইরে পাথর ছোঁড়া এবং পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি না দেওয়ার মতো পূর্ববর্তী ঘটনাগুলো তুলে ধরে ইডি দাবি করে, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ।

আদালতের পর্যবেক্ষণ: উভয় পক্ষের সওয়াল শুনে বিচারপতিরা একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। বিচারপতি মিশ্র বলেন, “আমরা অনেক কিছু বলতে চাই, কিন্তু সব কিছুই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে যায়, যা উভয় পক্ষই ব্যবহার করে।” তিনি ইডি-র উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন, “ইডি আধিকারিকেরা কি সরাসরি ভিক্টিম? তাঁরা হয়তো কারও প্রতিনিধিত্ব করছেন।”

আদালতের তরফে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়, “আপনি কি সত্যিই বলছেন যে পশ্চিমবঙ্গের আইনের শাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে? কারণ এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন।” আদালত মনে করিয়ে দেয় যে, সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের হস্তক্ষেপের আর্জি প্রতিটি সরকারি সংস্থাই করে থাকে, কিন্তু তা হতে হবে জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে।

রাজ্য সরকারের সাফাই: রাজ্য সরকারের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী সওয়াল করেন যে, কেন্দ্র সরকার আদালতের অপব্যবহার করছে এবং নির্দিষ্ট কিছু যুক্তি দেখিয়ে অযথা সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। রাজ্য সরকারের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার প্রয়োগ করেছেন মাত্র।

আইনি লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ: ইডি-র আইনজীবী সিবিআই তদন্তের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী, ডিজিপি এবং পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে নজরদারি-সহ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ইডি-র বক্তব্য, এটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি যেখানে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ জরুরি। অন্যদিকে, বিচারপতির মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, আইনের শাসনের প্রশ্নটি কতটা সংবেদনশীল।

আগামী দিনে এই মামলা কোন দিকে মোড় নেয় এবং সুপ্রিম কোর্ট ইডি-র সিবিআই তদন্তের আরজিতে সিলমোহর দেয় কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে জল্পনা তুঙ্গে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.