স্বস্তি ফিরছে বিশ্ব বাণিজ্যে: দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ় প্রণালী খুলতে সম্মত ইরান

স্বস্তি ফিরছে বিশ্ব বাণিজ্যে: দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ় প্রণালী খুলতে সম্মত ইরান

ঘনিয়ে আসা যুদ্ধের কালো মেঘ কিছুটা হলেও কাটল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, দুই সপ্তাহের সংঘর্ষবিরতির শর্ত হিসেবে ইরান ‘হরমুজ় প্রণালী অবিলম্বে, সম্পূর্ণ এবং নিরাপদে খুলে দেওয়ার বিষয়ে’ সম্মতি দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের এই সিদ্ধান্তে বিশ্ব অর্থনীতি এবং পেট্রোপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।


ভারত ও বিশ্ব বাণিজ্যে হরমুজ়ের গুরুত্ব

হরমুজ় প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যা পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে। বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই পথেই পরিবাহিত হয়।

  • তেল ও গ্যাস আমদানি: যুদ্ধের আগে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ৪০ শতাংশ এই পথ দিয়েই আসত।
  • গ্যাসের জোগান: ভারত দৈনিক গড়ে ১৯.৫ কোটি আদর্শ ঘন মিটার (এমএমএসসিএমডি) গ্যাস কেনে, যার মধ্যে কাতার থেকে এই প্রণালী হয়ে আসত ৬০ এমএমএসসিএমডি।
  • রফতানি বাজার: ২০২৪-২৫ সালে পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭,৮০০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ১৬ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকা)।

রফতানিকারক মহলে স্বস্তি ও আশঙ্কা

ইরানের এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেছে ভারতীয় রফতানিকারকদের সংগঠন ‘ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনস’ (FIEO)। সংস্থার সভাপতি এসসি রালহান জানান, গত এক মাসে পেট্রোপণ্য ছাড়াও রাসায়নিক, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, চাল, ওষুধ এবং রত্ন ও গয়নার রফতানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে বাসমতি চাল ও পচনশীল কৃষিপণ্যের পরিবহণ খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছিল।

FIEO-র মতে, এই যুদ্ধবিরতির ফলে:

  1. পরিবহণ ব্যয় হ্রাস: জাহাজ চলাচলের জট কমবে এবং বিমার প্রিমিয়াম বা ‘ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম’ অনেকটাই কমবে।
  2. সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া: বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য গতি ফিরবে।

তবে রফতানিকারকদের মধ্যে আশঙ্কার সুরও রয়েছে। তাঁদের মতে, কোনো কারণে এই ‘অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি’ ব্যর্থ হলে সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় ভেঙে পড়তে পারে।


অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রভাব: কমবে কি তেলের দাম?

ইরানের হরমুজ় অবরোধের জেরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার রান্নার গ্যাসের বুকিং নিয়ে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। জলপথ খুলে যাওয়ার খবরে সেই বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।

ইন্ডিয়ান অয়েল ডিলার্স ফোরামের সভাপতি জন মুখোপাধ্যায় জানান, “হরমুজ় প্রণালী খুলে যাওয়ায় তেল ও গ্যাসের জোগান বাড়বে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগলেও পেট্রোপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হবে।”


প্রেক্ষাপট: কেন বন্ধ ছিল এই জলপথ?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলার পাল্টা জবাবে ২ মার্চ ইরান ‘শত্রুদেশগুলির জন্য’ হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছিল। যদিও ভারতের মতো মিত্র দেশগুলিকে তারা যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধের আবহে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং বিমা সংক্রান্ত জটিলতায় সরবরাহ ব্যবস্থা তলানিতে ঠেকেছিল। ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এই নতুন ঘোষণা বিশ্ব বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাবে বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.