উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের এক অভিজাত এলাকায় ঘটে গেল এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। পরকীয়া সম্পর্কের পথে কাঁটা সরাতে নিজের শাশুড়িকে বালিশ চাপা দিয়ে খুনের অভিযোগ উঠল বাড়ির বড় বৌমার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, অপরাধ ঢাকতে ডাকাতির সাজানো গল্প ফেঁদে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। বৈজ্ঞানিক তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজের সাহায্যে পুলিশ এই রহস্যের জট খুলে বৌমা ও তাঁর প্রেমিককে গ্রেফতার করেছে।
ঘটনার নেপথ্যে: সাজানো ডাকাতির ছক
গত সপ্তাহে গভীর রাতে লখনউয়ের ওই বাড়িতে প্রবীণ গৃহকর্ত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ঘটনার পরপরই বাড়ির বড় বৌমা পুলিশকে জানিয়েছিলেন যে, একদল ডাকাত ঘরে ঢুকে আলমারি ভেঙে গয়না ও নগদ টাকা লুট করেছে। বাধা দেওয়ায় তাঁর শাশুড়িকে শ্বাসরোধ করে খুন করে তারা পালিয়ে যায়। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ডাকাতি ও খুনের মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করে।
তদন্তে উঠে আসা অসঙ্গতি
তদন্তে নেমে লখনউ পুলিশের গোয়েন্দারা বেশ কিছু অস্বাভাবিক বিষয় লক্ষ করেন, যা থেকে সন্দেহের দানা বাঁধে:
- লুটের ধরন: আলমারি খোলা থাকলেও কেবল নির্দিষ্ট কিছু জায়গার জিনিসই সরানো হয়েছিল, যা পেশাদার ডাকাতদের কাজের ধরনের সঙ্গে মেলে না।
- প্রবেশ পথ: সদর দরজা বা জানলা ভাঙার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এতে স্পষ্ট হয় যে, আততায়ী পরিচিত কেউ অথবা বাড়ির ভেতর থেকেই কেউ দরজা খুলে দিয়েছিল।
- বৌমার বয়ান: জেরার সময় বৌমার কথায় বারবার অসঙ্গতি ধরা পড়ছিল এবং তিনি অতিমাত্রায় আতঙ্কিত হওয়ার অভিনয় করছিলেন বলে পুলিশের দাবি।
সিসিটিভি ও কল রেকর্ডসে ফাঁস আসল রহস্য
লখনউ পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে জানতে পারে, ঘটনার রাতে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি পেছনের দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকেছিল এবং কয়েক ঘণ্টা পর চুপিচুপি বেরিয়ে যায়। এরপরই বৌমার মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডস (CDR) পরীক্ষা করে দেখা যায়, জনৈক এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সময় ধরে কথা হয়েছে।
পুলিশ ওই ব্যক্তিকে আটক করলে জানা যায়, তিনি পেশায় একজন গাড়িচালক এবং ওই পরিবারের পূর্বপরিচিত। জেরার মুখে তিনি স্বীকার করেন যে, বৌমার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
খুনের উদ্দেশ্য: পরকীয়া ও ‘পথের কাঁটা’ সরানো
পুলিশি জেরায় জানা গিয়েছে, বৌমা ও তাঁর প্রেমিকের সম্পর্কের বিষয়টি শাশুড়ি কয়েকদিন আগে জেনে ফেলেছিলেন। তিনি বৌমাকে সাবধান করেছিলেন এবং পরিবারের বাকিদের কাছে সবটা ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সামাজিক সম্মান হারানো এবং পরকীয়া আড়াল করার ভয়েই বৌমা তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে মিলে শাশুড়িকে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষেন। পরিকল্পনা মাফিক ঘটনার রাতে পেছনের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং দুজনে মিলে প্রবীণ মহিলাকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করেন।
পুলিশের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
লখনউ পুলিশের ডিসিপি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন:
“এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল। অপরাধীরা ভেবেছিল ডাকাতির গল্প ফেঁদে তারা পার পেয়ে যাবে, কিন্তু আধুনিক ফরেনসিক তদন্ত ও ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে।”
পুলিশ ইতিমধ্যেই খুনে ব্যবহৃত বালিশ এবং তথাকথিত লুটে যাওয়া গয়না উদ্ধার করেছে। আদালতের নির্দেশে ধৃত বৌমা ও তাঁর প্রেমিককে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। একটি অবৈধ সম্পর্কের জেরে একটি সাজানো পরিবার কীভাবে ধ্বংস হয়ে গেল, এই ঘটনা তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

