বিলীয়মান বসন্ত: জলবায়ু পরিবর্তনের কোপে বাংলা-সহ গোটা উপমহাদেশ, অশনি সংকেত আবহাওয়াবিদদের

বিলীয়মান বসন্ত: জলবায়ু পরিবর্তনের কোপে বাংলা-সহ গোটা উপমহাদেশ, অশনি সংকেত আবহাওয়াবিদদের

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে যে বসন্তের ‘মধুর’ রূপ বর্ণিত হয়েছে, আধুনিক জলবায়ু পরিবর্তনের দাপটে সেই ঋতু আজ অস্তিত্ব সংকটে। নীল দিগন্তে পলাশ-শিমুলের আগুন ঝরলেও, ফাগুন হাওয়ার সেই চিরচেনা মেদুরতা ক্রমেই উধাও হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, ঋতুচক্রের এই খামখেয়ালিপনায় ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে কার্যত ‘বসন্ত’ ঋতুটি মুছে যাওয়ার পথে।

শীতের পরেই গ্রীষ্মের হানা: পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা

গত বছরের মতো এ বারও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই শীত বিদায় নিয়ে গ্রীষ্মের পদধ্বনি শোনা গিয়েছে। বিশেষত উত্তর ও পশ্চিম ভারতে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই হানা দিয়েছে তাপপ্রবাহ।

  • মুম্বই: ১০ মার্চ তাপমাত্রা পৌঁছেছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৭.৬ ডিগ্রি বেশি। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’।
  • হিমাচল প্রদেশ: মার্চের শুরুতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৮ ডিগ্রি বেশি ছিল।
  • দিল্লি ও তৎসংলগ্ন এলাকা: সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ৫-৭ ডিগ্রি বেশি।

বাংলার চিত্র: সাময়িক স্বস্তি না কি ঝড়ের আগের স্তব্ধতা?

পূর্বাঞ্চলীয় আবহাওয়া দপ্তরের প্রধান হবিবুর রহমান বিশ্বাস জানিয়েছেন, গত বছর পশ্চিমবঙ্গে বসন্তের দেখা মেলেনি; শীত থেকে সরাসরি গ্রীষ্ম এসেছিল। তবে এ বছর বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ বলয়ের উপস্থিতির কারণে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত আবহাওয়া কিছুটা মনোরম ছিল। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ইসমাইল মন্ডলের মতে, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা (Sea Surface Temperature) দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী বিপদের সংকেত।

জনস্বাস্থ্য ও কৃষিতে অশনি সংকেত

বসন্ত উবে যাওয়ার অর্থ হলো দীর্ঘ ও তীব্র দাবদাহের কাল। এর প্রভাব হবে বহুমুখী:

  • কৃষি: ফাল্গুনের দাবদাহে ফসলের উৎপাদন চক্র ও ফুলের প্রস্ফুটন ব্যাহত হচ্ছে। রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার জানিয়েছেন, আবহাওয়ার এই নতুন ‘প্যাটার্ন’ নিয়ে তাঁরা সতর্ক এবং কৃষকদের সচেতন করার কাজ চলছে।
  • জনস্বাস্থ্য: রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় শরীর দিনের ক্লান্তি থেকে শক্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে না। শহর অঞ্চলে বিশেষ করে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় উচ্চ আর্দ্রতা স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
  • বাস্তুতন্ত্র: উপকূলীয় এলাকায় আপেক্ষিক আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আবহাওয়া অসহ্য গুমোট ও অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।

‘লা নিনা’-ও হার মানছে উষ্ণায়নের কাছে

প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা কম থাকার পরিস্থিতি বা ‘লা নিনা’ চললে সাধারণত ঝড়বৃষ্টি ও ঠান্ডা বাড়ার কথা। কিন্তু গত কয়েক বছরের প্রবণতা বলছে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়নের দাপটে ‘লা নিনা’-র প্রভাব ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালটি ছিল নথিভুক্ত ইতিহাসের তৃতীয় উষ্ণতম বছর। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিই এর মূল কারণ।

উপসংহার

শীতকালীন বৃষ্টিপাত বা তুষারপাতের ঘাটতি (ফেব্রুয়ারিতে ৮১ শতাংশ ঘাটতি) এবং মার্চের শেষে অকাল তুষারপাতের মতো ঘটনা প্রমাণ করছে যে প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত’। কিন্তু বাস্তবের রূঢ় পরিস্থিতি বলছে, প্রকৃতির ক্যালেন্ডার থেকে বসন্ত হয়তো চিরতরে হারিয়ে যেতে বসেছে। কবি জয় গোস্বামীর কথা ধার করে এখন হয়তো ‘মানসিক বসন্ত’ নিয়েই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.