পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সংঘাত এবার পুরদস্তুর যুদ্ধের রূপ নিল। শনিবার আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানি বিমান হামলার কড়া বদলা নিতে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে হামলা শুরু করেছে তালিবান বাহিনী। বৃহস্পতিবার রাতে তালিবান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের সেনারা নাইট ভিশন এবং লেজ়ার নিয়ন্ত্রিত উন্নত সমরাস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তানি ফ্রন্টিয়ার কোরের একাধিক ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে।
তালিবানের হুঁশিয়ারি ও রণকৌশল
তালিবান সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লা মুজাহিদ এক বিবৃতিতে যুদ্ধের ডাক দিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে বলেন, “আমাদের সেনারা ইতিমধ্যেই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আক্রমণ শুরু করেছে। এবার ওদের (পাকিস্তানি ফৌজ) নরকে পাঠাব।” আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলির খবর অনুযায়ী, ডুরান্ড লাইন পেরিয়ে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বালোচিস্তান প্রদেশের বেশ কিছু এলাকায় প্রবেশ করেছে আফগান সেনারা। খোস্তের আলিশের এবং নঙ্গরহর ও কুনার সীমান্তে পাকিস্তানি ফ্রন্টিয়ার কোরের বেশ কয়েকটি চৌকি এখন তালিবানের কবলে।
সংঘাতের পটভূমি: শনিবারের বিমান হামলা
গত শনিবার আফগানিস্তানের নঙ্গরহর ও পকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। ইসলামাবাদের দাবি ছিল, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP)-এর ডেরা লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় ৭০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে তালিবান এই দাবি অস্বীকার করে জানায়, হামলায় অন্তত ১৯ জন সাধারণ গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়েছে। সেই ঘটনার পরেই তালিবান সরকার দ্রুত প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
ডুরান্ড লাইন বরাবর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
বর্তমানে নঙ্গরহর, নুরিস্তান, কুনার, খোস্ত, পকতিয়া এবং পকতিকা প্রদেশে ডুরান্ড লাইন বরাবর দু’পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি চলছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিযোগ, টিটিপি এবং বালোচ বিদ্রোহী গোষ্ঠী (BLA)-কে মদত দিচ্ছে তালিবান। পাকিস্তান এই দুই গোষ্ঠীকে যথাক্রমে ‘ফিতনা আল-খোয়ারিজ়’ এবং ‘ফিতনা আল হিন্দুস্তান’ নামে অভিহিত করে। অন্যদিকে তালিবানের দাবি, পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নির্দেশে শর্ত লঙ্ঘন করে বারবার আফগান গ্রামগুলিতে হামলা চালানো হচ্ছে।
কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও অতীতের সংঘাত
২০২২ সালে টিটিপির সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের শান্তিবৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই সীমান্ত পরিস্থিতি অশান্ত। ইতিপূর্বে কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় দু’দেশের মধ্যে সংঘর্ষবিরতি হলেও তা স্থায়ী হয়নি। গত বছরের অক্টোবরে তালিবান বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ভারত সফরের দিনও আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছিল পাকিস্তান, যা নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি
- আক্রান্ত এলাকা: খাইবার পাখতুনখোয়া, বালোচিস্তান ও ডুরান্ড লাইন সংলগ্ন আফগান প্রদেশ।
- তালিবানের দাবি: আধুনিক সমরাস্ত্রের ব্যবহার ও পাক সেনা চৌকি দখল।
- ক্ষয়ক্ষতি: শনিবারের পাক হামলায় ১৯ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু।
- মধ্যস্থতা: কাতার ও তুরস্ক আগে চেষ্টা করলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
পরিস্থিতি যে দিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বড় আকারের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

