সাড়ে ১৭ বছর পরে সিঙ্গুরের জমিতে ফের ন্যানো কারখানার ছাউনির আদল! টাটার সেই ‘গুড এম’ আসছেন সেই ‘টাটার মাঠে’

সাড়ে ১৭ বছর পরে সিঙ্গুরের জমিতে ফের ন্যানো কারখানার ছাউনির আদল! টাটার সেই ‘গুড এম’ আসছেন সেই ‘টাটার মাঠে’

দূর থেকে কাঠামোটা একঝলক দেখলে বিভ্রম তৈরি হচ্ছে। ‘টাটার মাঠে’ সেই গাড়ি কারখানার ছাউনির আদলেই কী যেন তৈরি হচ্ছে! মাঠ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আর্থমুভার, পে-লোডার, রোলার ইত্যাদি ভারী যন্ত্র! আবার কারখানা? তবে সে বিভ্রম কেটেও যাবে। কারণ সিঙ্গুর জেনে গিয়েছে, ‘টাটার মাঠে’ কী হচ্ছে। টাটা আসছে না। কিন্তু সিঙ্গুর থেকে কারখানা গুটিয়ে নেওয়া রতন টাটাকে যিনি সানন্দে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের রাজ্যের সাণন্দে, তিনি আসছেন সেই সিঙ্গুরের সেই মাঠে।

তিনি নরেন্দ্র মোদী। পর পর দু’দিন তিনি পশ্চিমবঙ্গে জনসভা করবেন। ১৭ জানুয়ারি, শনিবার উত্তরবঙ্গের মালদহে। ১৮ জানুয়ারি দক্ষিণবঙ্গের সিঙ্গুরে। ১৮ জানুয়ারির সভাটি মোদী করবেন ‘টাটার মাঠে’। সিঙ্গুরে ন্যানো প্রকল্পের জন্য যে জমি অধিগ্রহণ হয়েছিল, এটিই এখন তার ডাকনাম। ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় হাজার একরের প্রান্তর জুড়ে অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমেছিল। কারণ, টাটা গোষ্ঠীর তৎকালীন কর্ণধার রতন টাটা ঘোষণা করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুর থেকে তিনি প্রকল্প সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন গুজরাতের সাণন্দে। শুনিয়েছিলেন এক ‘গুড এম’ (মোদী) এবং এক ‘ব্যাড এম’ (মমতা)-এর কথা। দাবি করেছিলেন, তাঁর মাথায় শুধু বন্দুক ধরা হয়নি, ট্রিগার টিপে দেওয়া হয়েছে। তাই ন্যানো প্রকল্প সরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। জানিয়েছিলেন, গুজরাতের সাণন্দে নিয়ে যাচ্ছেন কারখানা। যে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন নরেন্দ্র মোদী। সাড়ে ১৭ বছর পরে সেই মোদী, সেই সিঙ্গুর, সেই ‘টাটার মাঠ’ আবার এক বিন্দুতে এসে মিলছে। শুধু গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী।

প্রধানমন্ত্রীর যে কোনও জনসভার জন্যই পশ্চিমবঙ্গে ‘হ্যাঙার’-এর ব্যবস্থা হয়। ইস্পাতের সার সার স্তম্ভ, তার উপরে ইস্পাতেরই তৈরি দোচালা ছাউনির মতো দেখতে কাঠামো। সে কাঠামোর উপরে পুরু, সাদা ত্রিপলের আচ্ছাদন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি হওয়া মঞ্চ শুধু নয়, দর্শকাসনও সেই ছাউনির নীচেই থাকে। সিঙ্গুরের ময়দানে একটি ‘হ্যাঙার’ ইতিমধ্যেই মাথা তুলেছে, ঘটনাচক্রে যার আদল সেই কারখানার ছাউনির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তার সামনে ঘুরছে আর্থমুভার ও রোলার। কোথাও মাটি ফেলা হচ্ছে, কোথাও মাটি সরানো হচ্ছে, কোথাও রোলার চালিয়ে সে মাটি সমান করা হচ্ছে।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার সিঙ্গুরের বেরাবেড়ি, খাসেরভেড়ি, সিঙেরভেড়ি, বাজেমেলিয়া এবং গোপালনগরের মোট পাঁচটি মৌজার ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল ন্যানো প্রকল্পের জন্য। ‘অনিচ্ছুক’ কৃষকেরা দাবি করেছিলেন, তাঁদের ‘উর্বর জমি’ জোর করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সেই ‘বলপূর্বক’ অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। কারখানা তৈরির কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ হয়ে গেলেও পিছু হটতে হয় টাটাকে। ২০০৮ সালে সিঙ্গুর থেকে কারখানা গুটিয়ে গুজরাতের সাণন্দে চলে যায় টাটা মোটরস্‌। বুদ্ধদেবের ‘স্বপ্নের প্রকল্প’ চলে যায় মোদীর হাতে।

আবার সেই সিঙ্গুর আন্দোলনই ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহাকরণে পৌঁছোনোর পথ প্রশস্ত করে দেয়। তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তৃণমূল সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকের প্রথম সিদ্ধান্তই ছিল সিঙ্গুরের ‘অনিচ্ছুক’ চাষিদের জমি ফেরত দেওয়া। সেই মর্মে আইনও তৈরি করা হয়েছিল। সে আইন ঘিরে টানাপড়েন হাই কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে যায়। অবশেষে ২০১৬ সালে শীর্ষ আদালত রায় দেয়, কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দিতে হবে। ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসে মমতা সিঙ্গুরের কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেন। ন্যানো অর্ধসমাপ্ত কারখানা এবং অনুসারী শিল্পের কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। তবে পুরো জমিতে কৃষিকাজ এখনও শুরু করা যায়নি। কারণ, অনেক জায়গাতেই কংক্রিটের কাঠামো ভূতলে এবং ভূগর্ভে রয়ে গিয়েছে। তেমনই এক অনাবাদী অংশকে বেছে নেওয়া হয়েছে মোদীর সভাস্থল হিসাবে।

রাজ্য বিজেপির তরফে প্রধানমন্ত্রীর সভা আয়োজনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘এখানকার চাষিরাও আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে কিছু আশা করেন না। তাঁরাও এখন প্রধানমন্ত্রীর মুখ চেয়ে। প্রধানমন্ত্রীর সভার জন্য তাঁরা সানন্দে তাঁদের জমি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন।’’ জগন্নাথের কথায়, ‘‘রতন টাটাকে ‘ব্যাড এম’-এর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন যে ‘গুড এম’, এখন সিঙ্গুর সেই ‘গুড এম’-এর অপেক্ষায়।’’

পশ্চিমবঙ্গে শেষ চারটি জনসভার প্রত্যেকটিতেই রাজ্যের শিল্পেক্ষেত্রের ‘করুণ’ দশার কথা বলে বামফ্রন্ট ও তৃণমূলের সরকারকে আক্রমণ করেছেন মোদী। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে শিল্প তথা বিনিয়োগের সুদিন ফেরাবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও বার বার পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্র নিয়ে সরব হচ্ছেন। শিল্পক্ষেত্রে প্রথম সারিতে থাকা একটি রাজ্য গত পাঁচ দশকে কী ভাবে শিল্পপতিদের পছন্দের নিরিখে তলানিতে চলে গিয়েছে, বার বার সে কথা মনে করাচ্ছেন। বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও শিল্পায়ন তথা বিনিয়োগ একটি বড় জায়গা পেতে চলেছে। কিন্তু যে সিঙ্গুরকে অনেকে রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনার ‘বধ্যভূমি’ বলে থাকেন, সেই সিঙ্গুর এবং সেই ‘টাটার মাঠ’-কেই প্রধানমন্ত্রীর সভাস্থল হিসাবে বেছে নেওয়ার মধ্যে মমতার সঙ্গে সঙ্ঘাত আরও তীব্র করে তোলার বার্তাও রয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.