ভারতীয় ক্রিকেটে ফের ম্যাচ গড়াপেটা ও স্পট ফিক্সিংয়ের কালো মেঘ। নাগাল্যান্ডের হয়ে রঞ্জি ট্রফি খেলা ক্রিকেটার রাচিত ভাটিয়ার একটি গোপন স্ট্রিং অপারেশন বা স্টিং অপারেশনের জেরে আইপিএল ও দিল্লি প্রিমিয়ার লিগ (DPL)-কে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তাঁর দাবি, চেন্নাই সুপার কিংসের (CSK) এক ক্রিকেটারের সঙ্গে সমঝোতা করে দলের গোপন তথ্য জুয়াড়িদের কাছে ফাঁস করতেন তিনি। এই গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে দিল্লি অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (DDCA)। যদিও ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (BCCI) এখনও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলে নি।
রাচিত ভাটিয়ার চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি
একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের গোপন অভিযানে রাচিত ভাটিয়ার একাধিক বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী:
- আইপিএলে কোটি কোটি টাকার লেনদেন: রাচিতের দাবি, ২০২৫ সালের আইপিএলে তিনি নিজেই পাঁচটি ম্যাচ গড়াপেটা করেছিলেন। স্ন্যাপচ্যাটের মাধ্যমে লন্ডনের জুয়াড়িদের কাছে সিএসকে-র অভ্যন্তরীণ তথ্য পাচার করতেন তিনি। প্রতিটি ম্যাচের জন্য ৬০ লক্ষ টাকা করে মোট ৩ কোটি টাকা পেয়েছিলেন তিনি।
- সিএসকের তথ্য ও স্পট ফিক্সিং: ২০২৬ সালের আইপিএলের সময় জুয়াড়িদের কাছে চেন্নাই সুপার কিংসের প্রথম একাদশ সংক্রান্ত গোপন তথ্য বিক্রি করতেন তিনি। রাচিতের বক্তব্য অনুযায়ী, টসের আগেই প্রথম একাদশের তথ্য সরবরাহ করা বা স্পট ফিক্সিংয়ের মাধ্যমে ম্যাচের পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার জন্য আইপিএলে ম্যাচ প্রতি ৬০ লক্ষ এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য ১ কোটি টাকা পর্যন্ত দেওয়া হতো।
- আগের গড়াপেটার ইতিহাস: ২০১৮-১৯ মরসুমে সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফিতেও গড়াপেটা করার কথা স্বীকার করেছেন রাচিত। ইচ্ছাকৃত দুটি ওয়াইড বল করার জন্য জুয়াড়িদের কাছ থেকে বল প্রতি ৮ লক্ষ অর্থাৎ মোট ১৬ লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন তিনি। এমনকি নাগাল্যান্ডের রঞ্জি দলে জায়গা পাকা করতে ১৫ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেছেন এই ক্রিকেটার।
- দিল্লি প্রিমিয়ার লিগ (DPL): আইপিএলের পাশাপাশি দিল্লি প্রিমিয়ার লিগেও গড়াপেটা হয়েছে বলে অভিযোগ। ডিডিসিএ-র এই টুর্নামেন্টে প্রথম একাদশের তথ্য বা স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য ৪০ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হতো বলে জানান তিনি।
সিএসকে ও বংশ বেদীর নাম ঘিরে জল্পনা
রাচিতের দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আইপিএলে ম্যাচ গড়াপেটা নিশ্চিত করতে প্রথমে তাঁর পছন্দের এক ক্রিকেটারকে চেন্নাইয়ের প্রথম একাদশে ঢোকানোর কথা ছিল। যে ক্রিকেটার তাঁকে এই গড়াপেটায় সাহায্য করেছে, সে দিল্লি প্রিমিয়ার লিগেও খেলে। তবে ২০২৬ সালের আইপিএলে রাচিতের পক্ষে ফিক্সিং সফল হয়নি, কারণ তিনি যে ক্রিকেটারকে ঠিক করেছিলেন, চোটের কারণে তিনি সিএসকে-র প্রথম একাদশে কোনো ম্যাচেই সুযোগ পাননি। তবে ওই ক্রিকেটার দিল্লি প্রিমিয়ার লিগে খেলেছিলেন।
সন্দেহের তির বংশ বেদী নামের এক ক্রিকেটারের দিকে রয়েছে, কারণ তিনি চোটের কারণে চেন্নাইয়ের হয়ে কোনো ম্যাচ খেলতে না পারলেও দিল্লি প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন। যদিও রাচিত সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো ক্রিকেটারের নাম প্রকাশ করেননি।
ডিডিসিএ-র কঠোর পদক্ষেপ ও তদন্তের দাবি
এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে দিল্লি অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (DDCA)। সংস্থার সচিব অশোক শর্মা জানিয়েছেন, অভিযোগের যথাযথ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে তাঁরা ইতিমধ্যে বিসিসিআইকে চিঠি দিয়েছেন।
অশোক শর্মা বলেন, “আমরা বিসিসিআইকে চিঠি পাঠিয়েছি। বোর্ডের নির্দেশমতো পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে। আমাদের কাছে কোনো ম্যাচের ভিডিও ফুটেজ চাওয়া হলে তা দেওয়া হবে। আপাতত বোর্ড অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে। এই বিষয়টি দিল্লি পুলিশ বা অপরাধ দমন শাখাকে দেখতে হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “স্টিং অপারেশনে যা দেখানো হয়েছে তা একটা রেকর্ডিং মাত্র। যা বলা হচ্ছে তার সত্যতা খতিয়ে দেখতে হবে। অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলে, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দেশের সম্মান এবং ডিডিসিএ-র স্বচ্ছতাই আমাদের কাছে সবার আগে।” দিল্লি প্রিমিয়ার লিগের মতো উদীয়মান টুর্নামেন্ট নিয়ে এই ধরনের অভিযোগের ফলে হাজার হাজার শিশুর ভবিষ্যৎ এবং লিগের সততা যে প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছে, সে বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডিডিসিএ সচিব।

