সমান্তরাল পরাধীনতার মুক্তিযোদ্ধা

সমান্তরাল পরাধীনতার মুক্তিযোদ্ধা

তৃতীয় পর্ব —- শতাব্দীর সেরা বিচার

সাম্যবাদের নামে যে সুখস্বপ্ন লাল পতাকার নিচে থাকা দেশগুলোর মানুষকে দেখানো হয়েছিল সেই সমস্ত দেশে কমিউনিজমের পক্ষে ও বিপক্ষে থাকা মানুষ নির্বিশেষে স্বীকার করে , প্রায় সাড়ে ৮ কোটি থেকে ১০ কোটি মানুষ কমিউনিজমের বলি হয়েছে। কিন্তু এই তথ্যগুলো পঞ্জিকৃত থাকলেও ইতিহাসের পাতাতে কোনদিনই আসেনি তার কারণ কমিউনিস্ট দেশগুলোর সংবাদপত্র ও শিক্ষাবিদদের নিয়ন্ত্রণ করা। এমনকি একবিংশ শতাব্দীতেও যে সমস্ত দেশে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কমিউনিস্টরা নগণ্য সেখানেও তাদের বিভিন্ন সংবাদপত্র , গণমাধ্যম,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে তৈরি করা ইকোসিস্টেম এখনো কমিউনিজম এর সঠিক রূপ বা তথ্যকে সামনে রেখে আলোচনাকে সামনে আনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক।
সোভিয়েত রাশিয়ায় স্ট্যালিনের আমলে ‘গুলাগ’ বন্দী শিবিরে লক্ষ লক্ষ মানুষের করুণ পরিস্থিতিতে মৃত্যু, রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণের নামে কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষাধিক কর্মকর্তাদের হত্যা, কৃষকদের কাছ থেকে শস্য কেড়ে নিয়ে তাদের অনাহারে রেখে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার ইতিহাস বিশ্বের সামনে প্রায় আসে নি বললেই চলে। আর এইসবই করা হয়েছে একটা আদর্শের নামে, একটা আদর্শ সমাজব্যবস্থা তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
কিন্তু মার্ক্সের ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’র দেখানো পথে সোভিয়েত রাশিয়ার মানুষ পরাধীন হয়ে গেলো নিজের দেশের কমিউনিস্ট ব্যবস্থার। আর এই ব্যবস্থা তার দ্বারা ঘটিত অপরাধের চিহ্নমাত্র রাখে নি। কিভাবে? এর উত্তরটাও ক্রাভচেঙ্কো দিয়েছেন নিজের আত্মজীবনীতে।
‘I Choose Freedom’ গ্রন্থের ‘While History is Edited’ অধ্যায়ে ক্রাভচেঙ্কো দেখিয়েছেন কীভাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য ইতিহাসকে বিকৃত করত এবং মানুষের স্মৃতি থেকে সত্য মুছে ফেলার চেষ্টা করতো। ক্রাভচেঙ্কো বর্ণনা করেছেন কীভাবে পুরনো ইতিহাস বই তুলে নেওয়া হতো এবং নতুন করে লেখা হতো। কমিউনিস্ট পার্টির কাছে ইতিহাস কোনো স্থায়ী সত্য নয় বরং তাদের লক্ষ্য পূরণের জন্য ইচ্ছানুযায়ী পরিবর্তন করা যায়। ক্রাভচেঙ্কো দেখিয়েছেন কীভাবে জ্যেষ্ঠ কমিউনিস্ট নেতারা, যারা বিপ্লবের অন্যতম কারিগর ছিলেন, তাদের হঠাৎ ‘জনগণের শত্রু’ বা বিদেশি গুপ্তচর হিসেবে ঘোষণা করা হতো। ইতিহাসকে এমনভাবে পুনর্লিখন করা হতো যেন মনে হয় তারা কখনোই গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিলেন না।এমনকি পুরনো আলোকচিত্র থেকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের মুখ এয়ারব্রাশ করে সরিয়ে দেওয়া হতো।লেখকদের নির্দেশ দেওয়া হতো এমনভাবে সাহিত্য বা ইতিহাস লিখতে যা স্টালিনের ভাবমূর্তিকে একচ্ছত্র ও নির্ভুল হিসেবে তুলে ধরে। ক্রাভচেঙ্কো একে ‘মানসিক দাসত্ব’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি জানতেন যে সত্য কী, কিন্তু তাকে বাধ্য হয়ে সেই মিথ্যা ইতিহাসের অংশ হতে হতো। তিনি বর্ণনা করেছেন সেই ভয়ের পরিবেশকে, যেখানে সামান্য একটি ভিন্নমত বা পুরনো কোনো তথ্যের উল্লেখ প্রাণহানির কারণ হতে পারতো।ক্রেভচেঙ্কো একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরেছেন – যে রাষ্ট্র অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করে, সে বর্তমানকেও নিয়ন্ত্রণ করে।* ইতিহাস এডিটিং বা সম্পাদনা করা কেবল বই পরিবর্তনের বিষয় ছিল না, এটি ছিল মানুষের চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। মানব ইতিহাসের কলঙ্কময়, নৃশংসতার লজ্জাজনক অধ্যায়কে মুছে ফেলা হয়েছিল — যা জেনে সমাজ নিজেকে সুরক্ষিত রাখার পথ পেতে পারতো। ক্রাভচেঙ্কোর কথায় —
“১৯৩৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির একটি নতুন সরকারি ইতিহাস প্রকাশ সোভিয়েত মহা-শুদ্ধি অভিযানের (super-purge) ক্রমান্বয়ে কমে আসার দিকটি নির্দেশ করে।
এর মানে এই নয় যে সন্ত্রাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, বা ব্ল্যাক রাভেনরা (গুপ্ত পুলিশের কালো গাড়ি) বেকার হয়ে পড়েছিল। হাজার হাজার “স্বাভাবিক” গ্রেপ্তার, বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড, দুর্গম অঞ্চলে যাদের শ্রম প্রয়োজন এমন “অবাঞ্ছিত উপাদান”দের নির্বিচারে নির্বাসন, নির্যাতন এবং জিজ্ঞাসাবাদ চলতেই থাকে। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এবং বাধ্যতামূলক শ্রম শিবিরগুলোর বন্দিসংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। ইতিমধ্যেই, ক্রেমলিনের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কমিউনিস্টদের মধ্যে ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছিল যে, এই ক্রীতদাস শ্রমিকের সংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি; আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই অনুমান দুই কোটির কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। আমি কেবল এটাই বোঝাতে চাইছি যে, কিরভ হত্যাকাণ্ডের পরে পার্টি এবং আমলাতন্ত্রকে শুদ্ধ করার জন্য যে নির্দিষ্ট অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা এখন প্রায় সম্পন্ন। এমন কোনো অফিস বা প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক সংস্থা, সরকারি বা দলীয় অথবা সামরিক ব্যুরো ছিল না, যা মূলত নতুনদের হাতে চলে যায়নি। কোনো বিদেশি বিজেতা যদি সোভিয়েত ব্যবস্থার দখল নিয়ে নতুন লোকদের নিয়ন্ত্রণে বসাত, তাহলেও সেই পরিবর্তন এর চেয়ে বেশি ব্যাপক বা নিষ্ঠুর হতে পারত না।”
I choose freedom ( While history is edited , 302-306)।
একবার কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস সম্পর্কে বলতে ডাক পড়ে ক্রাভচেঙ্কোর। কিন্তু পার্টির সহকর্মীর করুণ ইতিহাস তিনি বলতে পারেন না —- “পেরভৌরালস্ক জেলার দায়িত্বশীল দলীয় সদস্যদের কাছে দলের ইতিহাসের একটি পর্যায়ের ওপর একটি ‘বক্তৃতা’ দেওয়ার দায়িত্ব আমার ওপর এসে পড়ল। আমি অবশ্য এই যন্ত্রণাদায়ক প্রহসনের অংশ হয়েছিলাম কেবল একটি কারণেই—এটি ছিল সিটি কমিটির নির্দেশ, যা অমান্য করার সাহস আমার ছিল না। আমার বক্তৃতার নির্দিষ্ট বিষয় ছিল: ‘কৃষির যৌথকরণের সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টি’। সরকারি ইতিহাসের প্রাসঙ্গিক অংশগুলো আমি মুখস্থ করেছিলাম, এই বিষয়ে স্তালিনের ভাষণগুলো পড়েছিলাম এবং তারপর মানুষে ভরা একটি মিলনায়তনে দাঁড়িয়ে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কেবল মিথ্যাই বলেছিলাম, যা করতে আমি বাধ্য ছিলাম।
প্রতিটি মিথ্যা বাক্যই যেন যৌথকরণ অভিযান এবং এর ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের সময়কার আমার নিজের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার আধা-শুকনো ক্ষতগুলোকে আবার খুঁচিয়ে তুলছিল। আমার মনে হচ্ছিল, ফোলা পেটওয়ালা যেসব শিশুদের মাঝে আমি কাজ করেছি, আমি যেন তাদেরই উপহাস করছি এবং গ্রামগুলোতে স্তূপাকার হয়ে থাকা যেসব মৃতদেহ আমি দেখেছি, সেগুলোকে অবমাননা করছি। আর কথা বলার পুরোটা সময় আমার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না যে, আমার শ্রোতারাও জানে আমি মিথ্যা বলছি। আমার কথা এবং তাদের হাততালি—উভয়ই ছিল সমানভাবে মেকি; আমরা ছিলাম অসংখ্য অভিনেতা, যারা একটি মর্মান্তিক রাজনৈতিক প্রহসনে কেবল নিজেদের নির্ধারিত চরিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছিলাম।”(I choose freedom ( While history is edited , 302-306)।
এই মিথ্যা আর অত্যাচারের দুনিয়া থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন ক্রাভচেঙ্কো। ক্রাভচেঙ্কো প্রথম সোভিয়েত-ডিফেক্টর নন, এর আগেও প্রচুর কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতারা পালিয়েছেন।
স্ট্যালিনের পলিটব্যুরোর ব্যক্তিগত সচিব বোরিস বাজানভ ১৯২৮ সালে মধ্য এশিয়া সীমান্ত দিয়ে পারস্যে (ইরান) পালিয়ে যান। তিনিই ছিলেন স্ট্যালিনের একদম নিকটবর্তী প্রথম কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ত্যাগ করেন। রেড আর্মির প্রতিষ্ঠাতা এবং তথাকথিত লাল বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নায়ক লিওন ট্রটস্কি স্ট্যালিনের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে হেরে ১৯২৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে নির্বাসিত হন।
পশ্চিম ইউরোপে সোভিয়েত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (GRU)-র প্রধান ওয়াল্টার ক্রিভিটস্কি ১৯৩৭ সালে ‘গ্রেট পার্জ’ শুরু হলে ফ্রান্সে পালিয়ে যান এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন।
কিন্তু এদের মধ্যে ক্রাভচেঙ্কোর ঘটনার বিশেষত্ব এই যে তিনি শুধু সোভিয়েত রাশিয়া থেকে পালিয়ে যান নি, সোভিয়েত রাশিয়ায় কমিউনিস্ট শাসকদের নৃশংসতা আদালত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন আর কোনো দেশের আদালতের বিচারে কমিউনিস্ট তন্ত্রের মানবতাবিরোধী রূপ প্রমাণিত হয়।
​’I Chose Freedom’ বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্বে সোভিয়েত ব্যবস্থার আসল চেহারা উন্মোচিত হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সোভিয়েত সমর্থিত ফরাসি কমিউনিস্ট সাময়িকী ‘Les Lettres Françaises’ ১৯৪৭ সালে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে দাবি করে যে, ক্রাভচেঙ্কো এই বই লেখেননি; এটি আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা ও সিআইএ (CIA)-র বানানো একটি মিথ্যা প্রোপাগান্ডা।
​এর জবাবে ক্রাভচেঙ্কো প্যারিসের আদালতে ফরাসি সাময়িকীটির বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক মানহানির মামলা (Defamation Lawsuit) দায়ের করেন।
​১৯৪৯ সালের শুরুতে প্যারিসে এই বিচার শুরু হয়, যাকে তৎকালীন সংবাদমাধ্যম “শতাব্দীর সেরা বিচার” (Trial of the Century) আখ্যা দিয়েছিল।ফরাসি কমিউনিস্টদের পক্ষে সমর্থন জানাতে মস্কো থেকে অনেক সোভিয়েত কর্মকর্তা ও ক্রাভচেঙ্কোর সাবেক সহযোগীদের প্যারিসে আনা হয়, যারা ক্রাভচেঙ্কোর চরিত্র হননের চেষ্টা করে। এমনকি তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীকেও তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে মস্কো থেকে পাঠানো হয়।
​কিন্তু ক্রাভচেঙ্কো অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজেই আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। তিনি গুলাগ (Gulag) বন্দিশিবির থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা বন্দিদের এবং সোভিয়েত নির্যাতন প্রত্যক্ষ করা অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শীকে ফ্রান্সে এনে সাক্ষ্য দেওয়ান।
​ ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল আদালত ক্রাভচেঙ্কোর পক্ষে রায় দেয়। আদালত স্বীকার করে যে বইয়ের সমস্ত তথ্য সত্য এবং ফরাসি পত্রিকাটিকে জরিমানা প্রদান করার নির্দেশ দেওয়া হয়।এই আইনি লড়াইটি ছিল আধুনিক ইতিহাসে সরাসরি কোনো আদালতের ভেতরে স্ট্যালিনবাদ এবং সোভিয়েত বন্দিশিবির ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আদর্শগত ও মানবিক এক ঐতিহাসিক জয়।
ভিক্টর ক্রাভচেঙ্কোর ঐতিহাসিক প্যারিস মানহানির মামলায় মার্গারেট বুবার-নিউম্যান ছিলেন প্রধান এবং সবচেয়ে মোক্ষম সাক্ষী। তিনি আদালতে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এবং স্ট্যালিনের গুলাগের মধ্যকার কাঠামোগত মিল ও ভয়াবহতার নিখুঁত বর্ণনা দেন। তাঁর এই সাক্ষ্য পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।মার্গারেট বুবার-নিউম্যানের ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত কালজয়ী স্মৃতিকথা ‘Under Two Dictators: Prisoner of Stalin and Hitler’ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দলিল। ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে দুটি ভিন্ন মতাদর্শের স্বৈরাচারী বন্দিশিবিরে (সোভিয়েত গুলাগ ও নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প) দীর্ঘ সময় বন্দি থাকার পর বেঁচে ফিরে তিনি এই গ্রন্থটি রচনা করেন।বুবার-নিউম্যান দেখিয়েছেন যে, চরম বামপন্থী স্ট্যালিনবাদ (কমিউনিজম) এবং চরম ডানপন্থী ফ্যাসিবাদ (নাৎসিবাদ)—বাইরে থেকে দেখতে বিপরীত মনে হলেও, প্রয়োগের জায়গায় তাদের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। উভয় ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মানবতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করা।
একজন একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট হিসেবে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে একটি তথাকথিত সামাজিক বিপ্লব শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার লোভ ও একনায়কতন্ত্রের হাতের পুতুল হয়ে তার নিজস্ব কর্মীদেরই বলি চড়ায়।
মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বন্দিদের ওপর অত্যাচারের ক্ষেত্রে স্ট্যালিন ও হিটলারের শাসনব্যবস্থা সমানভাবে অপরাধী—এটিই বইটির প্রধান বার্তা।
মানবতার দিক থেকে নাৎসীবাদের নামে ইহুদি জাতির গণহত্যা ( race genocide ) ও কমিউনিজমের নামে ‘শ্রেণী গণহত্যা’ (class genocide) দুটোই পাশবিক। সর্বগ্রাসী একনায়কতন্ত্র হিসেবে নাৎসীবাদ যতটা মানুষের মনে গেঁথে আছে কমিউনিজম তার ধারে কাছেও নেই , এমন কি দুটোর মধ্যে তুলনার কথাও সাধারণ মানুষের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়।
মানবতার অপরাধী এই দুই মতবাদ বা শাসনযন্ত্র নিয়ে দুইরকমের দৃষ্টিকোণ বা বলা যায় একটির স্বরূপ বিশ্বের সামনে প্রকাশিত হল আর অন্যটি আড়ালে তার কারণ – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল।
নাৎসীবাদ তথা হিটলারের জার্মানির হারের ফলে তার নিষ্ঠুরতা প্রকাশ্যে এলো, তিরস্কৃত হল কিন্তু কমিউনিজমের কেন্দ্র তথা স্তালিনের সোভিয়েত রাশিয়া জয়ী দলের সদস্য ( মিত্র শক্তি) হওয়ায় কমিউনিজমের ভয়াবহতা বিশ্বের সামনে আসতে আরো অর্ধশতাব্দী সময় লেগে গেলো। ততদিনে এই বিষ আরো কিছু দেশে ছড়িয়ে গেছে। নাৎসীবাদ বিকশিত ইউরোপকে তছনছ করায় তা বিশ্বের সামনে যতটা বিধ্বংসী মনে হয়েছে , কমিউনিজম অপেক্ষাকৃত অনুন্নত রাশিয়া ও এশিয়ায় ধ্বংসলীলা চালিয়েছে বলে ততটা বিধ্বংসী মনে হয় নি। বরং সোভিয়েত রাশিয়া একের পর এক যে পরিকাঠামোর উন্নতি করছিল তার পেছনে কত কোটি মানুষের রক্ত বয়ে গেছে তা রাশিয়ার লৌহ যবনিকা ভেদ করে বেরোতেই পারে নি। নাৎসীবাদের তুলনায় আরো একটা দিক থেকে কমিউনিজম ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছে। ইহুদীদের গণহত্যা অর্থাৎ ‘হলোকাস্ট’ করে সম্পূর্ণ জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য নাৎসীবাদকে ইহুদীরা ইতিহাসে যেভাবে জীবন্ত রেখেছে‌ তা কমিউনিজমের দ্বারা নিহতদের আত্মীয় ও আক্রান্তদের দ্বারা সম্ভব হয় নি। ইহুদীরা নিজেরা একটা ‘জাতি’ হিসেবে স্বঘোষিত ও স্বীকৃত কিন্তু কমিউনিজমকে সামনে রেখে যাদের গণহত্যা হয়েছে সেখানে ‘মার্ক্সবাদ’কে সামনে রেখে সমাজকে বিভিন্ন ‘শ্রেণী’তে ভাগ করে ‘শ্রেণী সংগ্ৰামে’র (class war) নামে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে আর সবথেকে আশ্চর্যজনক যারা ‘Enemy of the people’ অর্থাৎ ‘গণশত্রু’ হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে নিহত হয়েছে তারা নিজেরাও জানে না তারা ঐ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত !
নাৎসীদের দ্বারা কৃত অপরাধের বিচারে তৈরি হয় নিউরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল কিন্তু কমিউনিস্ট গণহত্যাকারীদের বিচার হয় নি। আর এইখানেই ক্রাভচেঙ্কোর বিশেষত্ব —– তাঁর মাধ্যমেই কমিউনিস্ট পার্টির পাশবিক অত্যাচার আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।
ক্রাভচেঙ্কো কেনো এত ঝুঁকি নিয়ে এই কাজে উদ্যত হলেন যেখানে সবসময়ই কেজিবি এজেন্ট দ্বারা নিহত হওয়ার ভয় থাকতো ? ক্রাভচেঙ্কোর উত্তর — “আমার দেশের মানুষ পুলিশি রাষ্ট্রের কবলে বন্দী; বিশ্ববাসীর কাছে তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা কিংবা কষ্টের কথা প্রকাশ করার মতো কোনো সুযোগই তাদের নেই। গণতান্ত্রিক দেশের জনগণ ও সরকারগুলোর কাছে ক্রেমলিন একনায়কতন্ত্রের আসল চেহারা আমি যতটুকু উন্মোচন করতে পারি, তার মাধ্যমে নিজেকে এই ভেবে স্বান্তনা দিই যে, বিশ্বকে আত্মপ্রতারণা থেকে সতর্ক করতে আমি সামান্য হলেও অবদান রাখছি। একটি আরো সভ্য ও সুন্দর পৃথিবী গড়ার জন্য কেবল সরকারগুলোর মধ্যে নয়, বরং এই পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মধ্যে আরও গভীর পারস্পরিক বোঝাপড়া ও প্রগাঢ় বন্ধুত্ব প্রয়োজন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্র কেবল রুশ জনগণের বা কেবল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সমস্যা নয়। এটি পুরো মানবজাতির সমস্যা। পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ জুড়ে বসবাসকারী মানবজাতির এক বিশাল অংশের এই আত্মবলিদান ও যন্ত্রণা থেকে সমগ্র বিশ্ব আর অনির্দিষ্টকালের জন্য মুখ ফিরিয়ে রাখার দুঃসাহস দেখাতে পারে না। এই জনগোষ্ঠী একটি দেবতাতুল্য শাসকগোষ্ঠীর অধীনে শোষিত, যারা পলিতব্যুরোর দলীয় যন্ত্র এবং বিশাল পুলিশ বাহিনীর শক্তির ওপর টিকে আছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের শত কোটি মানুষের কাছে তাদের নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের কোনো কণ্ঠস্বর নেই এবং তারা বিশ্বের অন্যান্য সমস্ত দেশ, মানুষ ও চিন্তাধারা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।”
— আই চুজ ফ্রিডম (উপসংহার, পৃষ্ঠা ৪৮০, ৪৮১), নিউ ইয়র্ক, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬।

১৯৬৬ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক সিটিতে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে মাথায় গুলির আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় ক্রাভচেঙ্কোর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।তাঁর ছেলে অ্যান্ড্রু ক্রাভচেঙ্কোসহ অনেকেই বিশ্বাস করেন যে এটি কোনো আত্মহত্যা ছিল না; বরং কেজিবির ঘাতকরাই তাঁকে হত্যা করে আত্মহত্যার রূপ দিয়েছিল।
ক্রাভচেঙ্কো তাঁর পরিণতির আশঙ্কা আগেই করেছিলেন কিন্তু তিনি বিশ্বশান্তির জন্য, মানবসভ্যতার জন্য কমিউনিস্ট শাসনের পতনের জন্য নিজের সবটুকু দিয়েছিলেন —-
“যেসব খুনিরা “প্রগতিশীল মানবজাতির” সেবার দোহাই দেয়, তারা হয়তো সময়ের সাথে সাথে আমাকে “মুছে ফেলতে” সক্ষম হতে পারে। এই ধার করা আয়ু হয়তো একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তারা এই রেকর্ড মুছে ফেলতে পারবে না, যা উৎসর্গ করা হয়েছে সেই দীর্ঘ-নির্যাতিত রুশ জনগণের উদ্দেশ্যে, যাদের মধ্য থেকেই আমার জন্ম। আমি আশা রাখার সাহস পাই যে একদিন তারা প্রকৃত স্বাধীনতা এবং সত্যিকারের অর্থনৈতিক গণতন্ত্র উপভোগ করতে পারবে।
যেদিন সেই শুভ দিন আসবে, সেদিন আমরা সত্যিই ‘এক পৃথিবী’র ভাবাদর্শের খুব কাছাকাছি পৌঁছাব। বিশ্বের এক-ষষ্ঠাংশ ভূখণ্ড—যা এখন আগ্রাসন এবং ছোট জাতিগুলোর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে আরও বিস্তৃতি লাভ করেছে—যতদিন পর্যন্ত একনায়কতান্ত্রিক দাসত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধকারের অধীনে থাকবে, ততদিন শান্তি বলতে গেলে অত্যন্ত অনিশ্চিত এক বিষয় হয়েই থাকবে।
বিশ্ব নিরাপত্তার পরবর্তী পদক্ষেপটি কোনো বিশ্বসংস্থার (আন্তর্জাতিক সংস্থা) মধ্যে নিহিত নেই—যদিও তা গড়ে ওঠা প্রয়োজন—বরং তা লুকিয়ে আছে তাদের স্বৈরাচারীদের হাত থেকে রুশ জনগণের মুক্তির মাঝে। শুধু কল্পনা করে দেখুন, কোনো অলৌকিক ঘটনায় যদি রাশিয়া হঠাৎ করে গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, তবে মানবজাতির শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলা অধিকাংশ উত্তেজনাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রশমিত হয়ে যাবে এবং বিশ্বজুড়ে বস্তুনিষ্ঠ সহযোগিতা সম্ভব হবে। আমাকে হয়তো বলা হতে পারে, একনায়কতন্ত্রের জোয়াল থেকে রাশিয়ার মুক্তি কেবল রাশিয়ানদের নিজস্ব বিষয়। যারা এমনটা ভাবেন তারা চরম ভুল করছেন। বহু দিক থেকেই সমস্ত সভ্যতার নিরাপত্তা এবং স্থায়ী শান্তির সুযোগ এই মুক্তির ওপরই নির্ভর করছে”।

পিন্টু সান্যাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.