বিধানসভায় কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর: দুর্নীতি রোধে আসছে নয়া আইন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলামের হুঁশিয়ারি শুভেন্দুর

বিধানসভায় কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর: দুর্নীতি রোধে আসছে নয়া আইন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলামের হুঁশিয়ারি শুভেন্দুর

রাজ্য প্রশাসনে দুর্নীতি নিয়ে পুনরায় তাঁর সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জ্ঞাপক প্রস্তাবে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি একগুচ্ছ কড়া পদক্ষেপের ঘোষণা করেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, চলতি অধিবেশনের শেষ দিনেই দুর্নীতি দমনে আরও কঠোর আইন আনতে চলেছে রাজ্য সরকার। এই নতুন আইন কার্যকর হলে দোষীদের শুধু কারাদণ্ডই হবে না, দুর্নীতিকারীদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা নিলাম করা হবে।

বক্তব্যের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে থাকা মুখ্যমন্ত্রী পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে নিশানা করে দাবি করেন, “তৃণমূল আর ক্ষমতায় ফিরবে না।” এর পাশাপাশি নাম না-করে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুঁশিয়ারি

বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানান, কোনো রূপ দুর্নীতি তাঁর সরকার বরদাস্ত করবে না। আইনি লড়াইয়ের সুযোগ নিয়ে যারা পার পাওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের সতর্ক করে তিনি বলেন,

“অনেকেই ভাবছেন, দু’মাস জেলে থেকে আইনি লড়াই করে বেরিয়ে আসবেন। তাঁদের মনে রাখতে হবে, এ বার আমরা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলাম করব। হরিশ চ্যাটার্জি রোড, হরিশ মুখার্জি রোড সহ আমতলার প্রাসাদগুলিতে কলকাতার উড়ালপুলের নীচে থাকা গৃহহীন মানুষদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে।”

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী পরোক্ষভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই নিশানা করেছেন। এছাড়াও জাহাঙ্গীর খান ও শওকত মোল্লাদের মতো নেতাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি। বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্তের প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সমস্ত সোনা ২০২১ সালের পরে কেনা হয়েছে। উল্লেখ্য, এদিনই আদালতে পুলিশ জানিয়েছে যে সব্যসাচী-মামলায় এ পর্যন্ত মোট ৬ কেজি সোনা ও দেড় কেজি রুপো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

ফিকি-বিতর্ক ও তদন্ত কমিশন গঠন

পূর্বতন সরকারের আর্থিক অনিয়মের খতিয়ান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে (BGBS) নিয়ম বহির্ভূতভাবে ‘ফিকি’ (FICCI)-কে ৩২৪.৭৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর স্বাক্ষর রয়েছে। এই ধরনের দুর্নীতি তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু এবং এডিজি পদমর্যাদার আইপিএস অফিসার কে. জয়রামনের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিশন গঠন করা হয়েছে। একশো দিনের কাজ (মনরেগা), আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের সমস্ত চুরির অভিযোগ এই কমিশনে জমা পড়বে এবং দোষীদের সাজা হবে বলে তিনি জানান।

ভবিষ্যতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে ইউপিএসসি (UPSC)-র ধাঁচে পরীক্ষা নেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রসঙ্গে সরকারের আয়-ব্যয় নিয়ে বিরোধী বিধায়ক কুণাল ঘোষের সমালোচনার জবাব দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বীরভূমের পাথর খাদানের উদাহরণ টানেন। তিনি জানান, আগে যেখানে বছরে ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসত, নতুন সরকারের প্রথম মাসেই সেখানে ৮৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। নাম না-করে তিনি অভিযোগ করেন, আগে বছরে বাকি ১১০০ কোটি টাকা ক্যামাক স্ট্রিট হয়ে দুবাইয়ে পাচার হয়ে যেত।

সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদল ও ঋতব্রতকে কটাক্ষ

বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনার মস্তিষ্কে ডাল-ভাত, আর হৃদয়ে লেনিন-মাও জে দং।” পার্ক সার্কাসের সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ করা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, কার নির্দেশে এই বদল হয়েছে তা তিনি না জানলেও কলকাতায় কোনো মোগল বা পঠানের নাম থাকবে না। বিরোধী দলনেতার প্রস্তাব অনুযায়ী, কার্তিক মহারাজ (প্রদীপ্তানন্দ মহারাজ)-এর নেতৃত্বে নাম পুনর্বিবেচনার জন্য একটি কমিটি গড়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি। একই সাথে ওপার বাংলায় (বাংলাদেশ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচিহ্ন লোপাট ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি আক্রান্ত হওয়া নিয়ে বিরোধীদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

২০২১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সেই সময় ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং ২,০০০-এর বেশি এফআইআর হয়েছিল। বিপরীতে তাঁর সরকারের আমলে এই সংখ্যা অনেকটাই কম। অতীতে বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া একাধিক মামলার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াই চ্যানেলে ধর্নায় বসলেও তাঁর সরকার কোনো বাধা দেয়নি।

অনুপ্রবেশ রুখতে কঠোর পদক্ষেপ ও পুশব্যাক

সীমান্ত সুরক্ষা ও অনুপ্রবেশ রোধে নিজের সরকারের অনড় অবস্থানের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বিধানসভায় তথ্য দিয়ে বলেন:

  • এ পর্যন্ত প্রায় ১০,০০০ অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানো হয়েছে।
  • বর্তমানে ১২টি হোল্ডিং সেন্টারে আরও ১,৮০০ জন বহিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
  • সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য বিএসএফ (BSF)-কে ১৪২.৭৯ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত সিল করার কাজ শেষ হবে।

বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগান স্মরণ করে উন্নয়নের বার্তা দেন তিনি।

বিধানসভায় কক্ষত্যাগ ও কুণাল ঘোষের অবস্থান

কালীগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আলিফা আহমেদ হকার উচ্ছেদ নিয়ে বলতে গেলে বিজেপি বিধায়কেরা ‘তমন্না হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে শোরগোল তোলেন। শুভেন্দু অধিকারীও সুর চড়িয়ে বলেন, “আপনি ভোটে জেতার পরেই তমন্না খুন হয়েছিল, আপনার মুখে গণতন্ত্রের কথা মানায় না।” এর পরেই বিরোধী দলনেতা ঋতব্রতের অনুগামীরা কক্ষত্যাগ করলে মুখ্যমন্ত্রী কটাক্ষ করে বলেন, “আসল তৃণমূল দাবি করা বিধায়কেরা পালিয়ে গেলেন।” তবে এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ মুখ্যমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে পূর্ণ সমর্থন জানান এবং ঋতব্রত শিবিরে যাওয়া অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও সমান পদক্ষেপের আর্জি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.