অব্যবহৃত হয়ে রয়েছে প্রায় ১২৫ কোটি টাকার ট্রামলাইন

কলকাতায় অব্যবহৃত হয়ে গিয়েছে প্রায় ১২৫ কোটি টাকার ট্রামলাইন। এর একটা বড় অংশ পিচের চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। এই লাইন আর কাজে লাগবে না। তুলে ফেলাও একরকম অসম্ভব।

সূত্রের খবর, ১৯৭২ সালে কলকাতা-হাওড়ায় ট্রামলাইনের দৈর্ঘ্য ছিল ৭৬ কিলোমিটার। পরে বন্ধ হয়ে যায় হাওড়ার ট্রাম। ২০০৮-’০৯ সালে কলকাতায় ট্রাম চলত ৩৭টি রুটে। এর জন্য লাইন পাতা হয়েছিল প্রায় ৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে। এর পর আস্তে আস্তে বিভিন্ন রুট বন্ধ হতে থাকে। কিন্তু লাইনগুলো আর তোলা হয়নি। আগে কেবল ট্রাম চলার জন্য যে সংরক্ষিত ট্র্যাক ছিল, তার প্রায় পুরোটাই পর্যায়ক্রমে অসংরক্ষিত হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ সেই অংশ দিয়ে অন্য সব ধরণের গাড়িও চলে। তাই সেই লাইন বসানো হয়েছিল রাস্তা খুঁড়ে। আরও পরে বিভিন্ন রুটে ট্রাম বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিচ দিয়ে সেই লাইন ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এখন ট্রাম চলছে প্রায় ১৩ কিলোমিটার পথে। অর্থাৎ ৭৬ কিলোমিটারের মধ্যে ৬৩ কিলোমিটার অংশে আর ট্রাম চলছে না। এর একটা বড় অংশ পিচে ঢাকা পড়ে গিয়েছে।

ট্রামলাইন তৈরি করতে খরচ কত পড়ে? সংস্থার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ সূত্রের খবর, ১৯৮৩, ’৮৪ ও ’৮৫ সালে বিশ্বব্যাঙ্কের টাকায় প্রায় ৪৭ কিলোমিটার অংশে সংরক্ষিত ট্র্যাকের লাইন সংস্কার হয়েছিল। তখন খরচ পড়েছিল কিলোমিটার-পিছু ৬২ লক্ষ টাকার মত। প্রায় ৯ বছর আগে সূর্য সেন স্ট্রিটে বেশ কিছু অংশে সংরক্ষিত ট্র্যাকে ট্রামলাইন বসানো হয়েছিল। তখন খরচ পড়েছিল কিলোমিটার-পিছু দেড় কোটি টাকা। এখন ওই খরচ অন্তত ২ কোটি টাকা। ট্রামলাইনের ওজন নিয়ে নানা সময় পুলিশ দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছে। ২০১৮-র সেপ্টেম্বরের গোড়ায় মাঝেরহাট সেতু বিপর্যয়ের পর আলোড়ণ হয়। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ভাঙা ব্রিজের অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন ট্রামলাইনকে। এর জন্য সে সময় বাম সরকারের উদাসীনতাকেই দায়ী করে তৃণমূল সরকার৷ কারণ, ট্রামলাইনের লোহার পাত না তুলে তার উপর একের পর এক পিচ-পাথরকুচি চাপিয়ে দেওয়ার জেরে বাম আমল থেকেই ধীরে ধীরে ওজন বাড়ছিল মাঝেরহাট ব্রিজের৷ ভাঙা ব্রিজ ফরেনসিক পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ১৯ বছর আগে মাঝেরহাট সেতুর উপর দিয়ে ট্রাম চলত। তারপর সেতুর উপর দিয়ে ট্রাম চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আগে ট্রাম চলাচল বন্ধ হলেও ট্রামের লাইন ব্রিজের উপর থেকে তোলা হয়নি।

পরীক্ষা করে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানান, ট্রামলাইন না তুলে তার উপরই বিটুমিন ও পিচ ফেলে ঢালাই করা হয়েছে। পিচের তলায় চলে গিয়েছে ট্রামলাইন। দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম লাইনের লোহার ট্র‌্যাকের ভারেই ক্ষয় হয়েছে মাঝেরহাট ব্রিজের। প্রতি মিটার ট্রামলাইনের ওজন প্রায় ৫৭ কেজি। সেতুর উপর লাইনের ভারেই ক্ষয় হয়েছে সেতুর। যদিও তৃণমূলের এক দশকের শাসনে বহু রাস্তায় ট্রামলাইন না তুলে আগের মতই ওপরে পিচ ঢেলে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় অভিযোগ, অব্যবহৃত ট্রামলাইনের মেরামতি না হওয়ায় বিভিন্ন রাস্তায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। গত আগস্ট মাসের গোড়ায় শহরের ২৪টি রাস্তা থেকে অব্যবহৃত ট্রামলাইন তুলে ফেলার অথবা ঢেকে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে লালবাজার। পথ নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনার পরে শহরের ওই ২৪টি জায়গার ট্রামলাইন তুলে ফেলতে বা ঢেকে দিতে রাজ্যের পরিবহণ সচিবকে চিঠি পাঠান কলকাতার ডিসি (ট্র্যাফিক) অরিজিৎ সিংহ।

সূত্রের খবর, বছরখানেক আগে রাজ্য সরকারের তৈরি করা বিশেষজ্ঞ কমিটি জানিয়েছিল, ট্রাম চলাচল করার ফলে আয়ু কমে যাচ্ছে বিভিন্ন উড়ালপুল ও সেতুর। তাই উড়ালপুল ও সেতু থেকে ট্রামলাইন তুলে ফেলার সুপারিশ করেছিল তারা। ওই কমিটির পরামর্শ মেনে শিয়ালদহ উড়ালপুল ও বেলগাছিয়া সেতু-সহ বিভিন্ন সেতু এবং উড়ালপুলে ট্রাম চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি, শহরের বেশ কিছু রাস্তায় সংস্কারের কাজের জন্য এমনিতেই বন্ধ রাখা হয়েছে ট্রামলাইন। পুলিশের বক্তব্য, এই সমস্ত কারণেই শহরের বহু এলাকায় ট্রামলাইন এখনও পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। সেই অব্যবহৃত ট্রামলাইনে কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে বেআইনি পার্কিং লট, কোথাও বা তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। যার জেরে ঘটছে দুর্ঘটনা। পুলিশের তরফে পরিবহণ ভবনে পাঠানো তালিকায় বেলগাছিয়া সেতু থেকে শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়, এ পি সি রায় রোড, এ জে সি বসু রোড, সিআইটি রোড, বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট, ওয়েলিংটন থেকে মৌলালি, রবীন্দ্র সরণি, অরবিন্দ সরণি ও ডায়মন্ড হারবার রোড থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত অব্যবহৃত ট্রামলাইন তুলে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। মৌলালি থেকে জগৎ সিনেমা পর্যন্ত ট্রাম বন্ধ রয়েছে অনেক দিন। আবার এ পি সি রায় রোডে ট্রাম চলাচল বন্ধ গত তিন বছর ধরে। একই ভাবে, উল্টোডাঙা ও সিআইটি রোডে ট্রাম বন্ধ রয়েছে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। পুলিশ জানিয়েছে, এই সমস্ত ট্রামরাস্তা তুলে ঢেকে দেওয়া হলে গাড়ির গতি বৃদ্ধি পাবে। দুর্ঘটনার আশঙ্কাও কমবে।

খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর অনুপ কুমার তোকদার (কলকাতা-৫৯) নামে এক ব্যক্তি একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে পাঠকের কলমে লেখেন, “সরকারের কাছে আবেদন, মাথার উপরে ইলেকট্রিক সার্কিটগুলো এখনই ধ্বংস করবেন না। সান ফ্রান্সিসকোতে দেখেছিলাম, টায়ারের চাকা লাগানো ট্রাম উপরের সার্কিট থেকে পাওয়ার নিয়ে দিব্যি চলছে। বরং তার চলার স্বাধীনতা আরও বেড়েছে, একই সঙ্গে ব্যাটারির ব্যবস্থা থাকার জন্য।“

২০১৯-এর অক্টোবর মাসে পুলিশ জানায়, শিয়ালদহ সেতুর অবস্থাও বিশেষ ভালো নয়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে সরানো হবে ট্রামলাইন ও পিচের আস্তরণ।কিন্তু প্রস্তাব ফাইলবন্দী হয়ে থাকে। ২০২০-র গোড়ায় আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন ওই সেতুর উপরে এক সময়ে লম্বা গাড়ির সারি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আদৌ ওই সেতু সেই ভার নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন পূর্ত দফতরের ইঞ্জিনিয়ারেরা। এর পরেই তাঁরা পরীক্ষা করে বোঝেন সেতুর স্বাস্থ্য ভাল নেই। দ্রুত বেলগাছিয়া সেতুর ওজন ঝরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ঠিক হয়, সেতুর ভার লাঘব করার কাজ দ্রুত শুরু হবে। এর জন্য সেতু থেকে ট্রামলাইন তুলে ফেলা হবে। সেই সঙ্গে সরানো হবে সেতু-পথের পিচ বা বিটুমিনের আস্তরণ। টালা সেতুর বিকল্প হিসেবে চিৎপুর লেভেল ক্রসিং তৈরি হয়ে গেলেই ওই কাজ শুরু করা হবে। প্রথম দফায় ট্রামলাইন তোলা শুরু হবে বোর্ডের পরীক্ষা পর্ব মিটলে। কাজ চলবে প্রায় দু’মাস। প্রশাসন সূত্রের খবর, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কংক্রিট কেটে লোহার লাইন তোলার সময়ে কোনও ঝাঁকুনিতে সেতুর যাতে ক্ষতি না হয়, সে দিকে বিশেষ নজর রাখা হবে। কিন্তু সূত্রের খবর, পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন হয়নি। প্রায় দেড়শ বছরের ঐতিহ্য কলকাতার ট্রাম এখন শেষের সেদিন গুনছে। হরেক ভাবনা আর হচ্ছে হবে-র জাঁতাকলে ট্রামের লাইনগুলো রয়ে গিয়েছে স্বস্থানেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.