মন্দিরে মম কে আসিলে হে!

              সকল গগন অমৃতগমন,

দিশি দিশি গেল মিশি অমানিশি দূরে দূরে ॥

              সকল দুয়ার আপনি খুলিল,

              সকল প্রদীপ আপনি জ্বলিল,

     সব বীণা বাজিল নব নব সুরে সুরে ॥

ভারতের মন্দিরগুলি শিল্পকলা, ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও হিন্দু জীবনদর্শনের এক সংমিশ্রণ। এগুলি হল একটি পবিত্র ক্ষেত্রের মধ্যে মানুষ ও ব্রহ্মের মিলনকেন্দ্র। ৯X৯ (৮১) গ্রিড-বিশিষ্ট ‘পরম সায়িক’ নকশা দেখা যায় বৃহদাকার প্রথাগত হিন্দু মন্দিরগুলিতে। হিন্দু মন্দির নির্মাণে যে বিভিন্ন প্রকার গ্রিড ব্যবহৃত হয়, এটি তার মধ্যে অন্যতম। এই ধরনের মন্দির হল সামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতির মন্দির। এখানে প্রত্যেকটি সমকেন্দ্রিক নকশার বিশেষ গুরুত্ব আছে। ‘পৈশাচিক পাদ’ নামে পরিচিত বাহ্যিক নকশাটি অসুর বা অশুভের প্রতীক। অন্যদিকে ভিতরের ‘দৈবিক পাদ’ নকশাটি দেবতা বা শুভের প্রতীক। শুভ ও অশুভের মধ্যে এককেন্দ্রিক ‘মানুষ পাদ’ মানবজীবনের প্রতীক। প্রতিটি নকশা ‘ব্রহ্মপাদ’কে ঘিরে থাকে। ব্রহ্মপাদ সৃষ্টিশক্তির প্রতীক। এখানেই মন্দিরের প্রধান দেবতার মূর্তি থাকে। ব্রহ্মপাদের একেবারে কেন্দ্রস্থলটি হল ‘গর্ভগৃহ’। এটি সবকিছু ও সবার মধ্যে অবস্থিত ব্রহ্মের প্রতীক।

 ভারতীয় প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলিতে মন্দিরকে বলা হয়েছে ‘তীর্থ’। এটি একটি পবিত্র ক্ষেত্র যার পরিবেশ ও নকশা হিন্দু জীবনদর্শনের প্রতিটি ধারণাকে প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করে।  জীবন সৃষ্টি ও রক্ষার প্রতিটি বিশ্বজনীন উপাদান হিন্দু মন্দিরে উপস্থিত – আগুন থেকে জল, দেবতার মূর্তি থেকে প্রকৃতি, পুরুষ থেকে নারীসত্ত্বা, অস্ফুট শব্দ ও ধূপের গন্ধের থেকে অনন্ত শূন্যতা ও বিশ্বজনীনতা – সবই মন্দিরের মূল আদর্শের অন্তর্গত।


দ্রাবিড় কলা ও কৃষ্টির প্রধান এবং প্রাচীনতম সাধন ক্ষেত্র তাঞ্জোর । অতীতের মহিমান্বিত সাধনার নিদর্শন তাঞ্জোরের বিপুল বৃহদেশ্বর মন্দিরে, বিরাট নন্দীর মূর্তিতে, অপূর্ব পুঁথি ও গ্রন্থশালায় প্রত্যক্ষ হয়। দেশ বিদেশের কলাবিদগণ তামিল সাহিত্য ও সঙ্গীত এবং নৃত্য কলায় আকৃষ্ট হয়ে বারবার তাঞ্জোরে এসেছেন। তাঞ্জোরের ধাতু শিল্প বিশ্বের মানুষকে যেমন বিস্মিত করে , তেমনি তার খ্যাতি দিক দিগন্তে প্রসারিত হয়েছে।শহরটি কাবেরী অববাহিকায় অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি কেন্দ্র এবং তামিলনাড়ুর #অন্নপাত্র হিসাবে পরিচিত।

তামিল সঙ্গম কালে ( খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকে চতুর্থ শতাব্দী) বিভিন্ন  রেকর্ডগুলির মধ্যে তাঞ্জোর বা তাঞ্জাবুর নামটি পাওয়া না গেলেও , বিদ্যান ও পন্ডিতদের মতানুসারে তাঞ্জোরের অবস্থান বহু প্রাচীন কাল থেকে।  কোভিল ভেন্নি, তাঞ্জোর থেকে ১৫ মাইল দূরে অবস্হিত একটি যুদ্ধক্ষেত্র , যেখানে চোল রাজ কারিকল, চেরস এবং পাণ্ড‍্য‍দের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধস্থল #ভেন্নির_যুদ্ধক্ষেত্র নামে পরিচিত। অনুমানিক তৃতীয় শতাব্দীতে কালভরোরা চোল সাম্রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। ফলত , রাজ্যটির অস্তিত্ব অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। বর্তমান তাঞ্জোরের আশেপাশের অঞ্চলটি ষষ্ঠ শতাব্দীতে মুথারায়রদের দ্বারা বিজিত হয়। এঁরা ৮৪৯ অবধি শাসন করেছিলেন।


আনুমানিক , ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে মধ্যযুগীয় চোলা রাজা বিজয়ালয় (৮৪১-৮৭৮) এর উত্থানের মধ্য দিয়ে চোলরা আরও একবার খ্যাতি লাভ করেছিলেন। #বিজয়ালয় “মুথারায়ার রাজা ইলেঙ্গো মুথারায়ারের ” কাছ থেকে তাঞ্জোর বিজয় করেন এবং দেবী #নিশুম্ভসুদনীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।  তাঁর পুত্র প্রথম আদিত্য (৮৭১ – ৯০১) এই শহরটিকে সকল দিক দিয়ে ধারণ করে রেখেছিলেন। চোল রাজা প্রথম পরন্তক  (৯০৭ – ৯৫০) এর সমসাময়িক রাষ্ট্রকূট রাজা দ্বিতীয় কৃষ্ণ (৮৭৮-৯১৪) দাবি করেছিলেন যে , তিনি পরন্তকে পরাজিত করে তাঞ্জোর জয় করেছিলেন, কিন্তু এই দাবির পক্ষে ইতিহাসে কোনও দলিল নেই।

ধীরে ধীরে, তাঞ্জোর চোল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে এবং আনুমানিক, ১০২৫ খ্রিস্টাব্দে গাঙ্গাইকোন্ডা চোলাপুরামের উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত এই সমৃদ্ধশালী নগর চোল সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসাবে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে উল্লিখিত হয়েছে।একাদশ শতাব্দীর প্রথম দশকে, চোল সম্রাট প্রথম রাজরাজ (৯৮৫ – ১০১০) তাঞ্জোরে বিখ্যাত  #বৃহদীশ্বর মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।  মন্দিরটি তামিল স্থাপত্যের অন্যতম উত্তম উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হয়। আজ সেই মন্দির নিয়েই আলোচনা করব।

বৃহদীশ্বর মন্দির, যাকে মন্দিরের ইতিহাসে রাজরাজেশ্বরম বা পেরুউদাইয়ার কোভিল নামেও অভিহিত করা হয়। কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত সমৃদ্ধশালী , ঐতিহ্যবাহী এবং ঐতিহাসিক তাঞ্জোরের অন্যতম মন্দির হল বৃহদীশ্বর মন্দির। ১০০৩ হতে ১০১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রথম রাজ রাজ চোল ভগবান শিবের নামে মন্দিরটি উৎসর্গ করেন। নানা ঘটনার সাক্ষী এই হাজার বছর পুরনো শিব মন্দির , যা ভারতের দক্ষিণের বৃহত্তম মন্দির  এবং দ্রাবিড় স্থাপত্য শিল্পের  অন্যতম উদাহরণ। এটিকে দক্ষিণা মেরু (দক্ষিণের মেরু) নামে অভিহিত করা হয়। ইউনস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় এই মন্দিরকে  “গ্রেট লিভিং চোল টেম্পলস” নামে অভিহিত করা হয়েছে।

বৃহদীশ্বর মন্দিরের থেকে কিছু উত্তর পূর্বে বিখ্যাত গঙ্গাইকোন্ডা চোলাপুরম মন্দির এবং ঐরাবতেশ্বর মন্দির অবস্থান করছে। ভারতের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সঙ্গে পরতে পরতে মিশে আছে মন্দির, দেবদেউল গুলি। শুধু ধর্মীয় গাম্ভীর্য নয়, স্থাপত্য শৈলী এবং দৃষ্টিনান্দনিকতার দিক থেকেও এই মন্দিরগুলি এক একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। ভারতের দক্ষিণ অংশে যে সব সনাতনী মন্দির স্থাপত্য দেখা যায়  , সেগুলির বিকাশ চালুক্য শাসনকালে পঞ্চম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে ব্যাপক হারে সূচিত হয়। যার ফলস্বরূপ নির্মিত হয় বাদামী, আইহোল এবং পট্টডাকাল  স্থাপত্য ভাস্কর্য। এর বর্ণালী ছটা পরবর্তী কালে পল্লব যুগের  মামল্লাপুরাম এবং অন্যান্য স্থাপত্য ভাস্কর্যগুলিতে সাক্ষ্য রচনা করেছিল। 


খ্রিস্টীয় ৮৫০ থেকে ১২৮০ – র মধ্যে চোল রাজবংশ পুনরায় প্রভাবশালী হয়ে উঠলেও প্রারম্ভিক পর্যায়ে যুদ্ধ বিগ্রহ, রাজনীতি , সাম্রাজ্য সুরক্ষা ইত্যাদি কারণে তাঁদের শিল্প , স্থাপত্য , ভাস্কর্যের উপর ততোধিক প্রাধান্য প্রদান করা বা ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করা সম্ভব হয় নি।   দশম শতাব্দীতে, চোল সাম্রাজ্যের মধ্যে বর্গাকার নগর নির্মাণ, বহু স্তরের স্তম্ভ নির্মাণ ইত্যাদির মতো শিল্প বৈশিষ্ট্যগুলির উত্থান ঘটে। জর্জ মিশেলের মতে  এই পর্যায় থেকেই নতুন চোল শৈলীর সূচনা  ইঙ্গিত প্রাপ্তি ঘটে।


বৃহদীশ্বর মন্দিরটি একটি সুদৃঢ় দুর্গমধ্যে অবস্থিত । এটি প্রস্তরের উচ্চ প্রাকার বেষ্টিত এবং চারিপার্শ্বে গড় দ্বারা সুরক্ষিত। দক্ষিণাত্যের স্থাপত্য কৌশলের এক অপূর্ব নিদর্শন এই তাঞ্জোর মন্দির। দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ মন্দিরের গোপুরমগুলিই উচ্চ এবং উৎকৃষ্ট শিল্প কার্য মন্ডিত হয়ে থাকে। মূল মন্দিরগুলি গোপুরমের তুলনায় ছোট হয়। 


কিন্তু বৃহদীশ্বর মন্দিরে গোপুরমের প্রাচুর্য নেই। এর মূল মন্দিরটিই অতি উচ্চ, বহুতলায় বিভক্ত এবং সূক্ষ্মকারুকার্য মন্ডিত একটি বিমান ভূমি হতে উর্ধ্বদিকে উত্থিত হয়েছে। এর আকার কাষ্ঠরথের ন্যায় এবং শিরোদেশের পরিকল্পনা মহাবলিপুরমের রথ ও ইলোরার কৈলাস মন্দিরের ছাঁচে গঠিত।
গড়ের উপর প্রস্তরের সেতু পার হলেই গোপুরম পাওয়া যাবে, প্রথম গোপুরমটি ৯০ ফুট এবং দ্বিতীয়টি ৬০ ফুট উচ্চ। দ্বারের পাশে বৃহদাকার দুইটি দ্বারপালকের মূর্তি অবস্থান করছে। এঁদের প্রায় উচ্চতা ১৮ ফুট। তাঁদের নেত্রদ্বয় শিল্পীর যন্ত্রের আঁচড়ে যেন সজীব ও ভীতিজনক হয়ে উঠেছে। বীরোচিত অবয়ব , সুতীক্ষ্ণ নয়ন, গাম্ভীর্যপূর্ণ মুখ দেখলেই বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়।


প্রথম ও দ্বিতীয় গোপুরমে মধ্যের প্রাঙ্গণের দৈর্ঘ্য ১৭০ ফুট এবং অভ্যন্তরে প্রাঙ্গণ দৈর্ঘ্যে ৮০০ ফুট এবং প্রস্থে ৪১৫ ফুট সমস্তুটাই প্রস্তর মন্ডিত। সমস্ত প্রাচীর সংলগ্নভাবে বহু কুঠুরি নির্মিত রয়েছে। অনুমান, এই কুঠুরিগুলি হয়ত সাধু সন্ন্যাসী, বিদ্যার্থীদের আবাস ছিল। প্রাচীনকালে দেবদেউলকে কেন্দ্র করে প্রতি তীর্থে ছোট বড় বিদ্যাভবন গড়ে উঠত। মূল মন্দিরটি বিশাল আয়তন, প্রায় ১৮০  ফুট উচ্চ। 

মন্দিরের শীর্ষে স্থাপিত কুম্বমের ওজন অন্তত ৮০ টন। বলা হয়‚ এটাই বিশ্বের গ্র্যানাইটে তৈরি প্রথম সম্পূর্ণ মন্দির। ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টন গ্র্যানাইট।
কিন্তু সব থেকে রহস্যজনক হল‚ মন্দিরের কাছে ১০০ কি.মি. ব্যাস অবধি কোথাও কোনও গ্র্যানাইট নেই। কী করে এত ভারী বিশাল আকারের পাথর বয়ে আনা হল‚ কে বা কারাই বা বয়ে আনল‚ সে প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।
আরও এক রহস্য হল এর নির্মাণ শৈলী। দ্বিপ্রহরে‚ সূর্য যখন মাঝ আকাশে ঠিক মাথার উপরে‚ তখন মন্দির চূড়া বা গোপূরমের ছায়া পড়ে না জমিতে। এই আশ্চর্য ঘটনার সাক্ষী থাকতে বহু দর্শনার্থী ভিড় করেন।


লোকমতে বলা হয়‚ মন্দিরের নিচে আছে অসংখ্য সুড়ঙ্গ। যেখান দিয়ে যাওয়া যায় অন্যান্য তীর্থস্থান ও মন্দিরে। এখন বেশিরভাগ পথই বন্ধ। কিন্তু অতীতে এই পথেই অন্য মন্দিরে যেতেন #সাধু_সন্ত‚ #পুরোহিত‚ #রাজন্য ও #রাণীরা। #শিবরাত্রি‚ #দীপাবলী‚ #মকর_সংক্রান্তির মতো তিথিতে বেশি করে ব্যবহৃত হতো এই সুড়ঙ্গপথ।


এই মন্দির প্রথম মহান ‘তামিল চোল’ স্থাপত্যের নকশা । সেই নকশা এখনও আছে মন্দিরের সংগ্রহশালায়। মন্দিরের বৈভবের বিবরণ ও নিয়ম আচার লিপিবদ্ধ করা আছে পুঁথিতে। সেই নিয়ম আচার আজও মেনে চলা হয়। মন্দিরের কারুকাজে ফুটে উঠেছে সে সময়ের সমৃদ্ধি ও জীবনবোধ। এরপর এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী থেকেই চোল শৈলী ভারতের বিভিন্ন স্থানে অন্য মাত্রায় রূপ পায়। জানা যায়, একবার রাজা স্বপ্নের মাঝে আদেশপ্রাপ্ত হন মন্দির স্থাপনের। সেই স্বপ্নাদেশেই রাজা এই রাজকীয় মন্দির স্থাপন করেন।


মন্দিরের ভেতরে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রাজার ও দেব-দেবীদের তৈলচিত্র, ব্রোঞ্জের তৈরি বিভিন্ন দেবতার মূর্তি। এই মন্দির থেকে প্রাপ্ত শ্ৰী নটরাজের একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি সংগ্রহ শালায় সংরক্ষিত আছে।  মন্দিরের স্থাপত্য ও শৈল্পিক নির্দশন অনেকটা শ্রীলঙ্কার   মন্দিরগুলির মতোই। বাস্ত্তু-শাস্ত্র এবং আগম-এর মতো প্রাচীন গ্রন্থের উপর নির্ভর করে গোটা মন্দিরটি নির্মিত। সেই সময় বাস্তুশাস্ত্রের স্থপতি হিসেবে পেরুনাথন এবং সোমবর্ণ ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়।


 মন্দিরের ভাষ্কর্যে তামিলনাড়ুর ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ভারতনাট্যমের নানা চিত্র পরিলক্ষিত হয়। বৃহদেশ্বর মন্দিরের প্রধান দেবতা শিব হলেও পাশাপাশি মন্দিরের দেওয়াল জুড়ে চন্দ্র, সূর্য, দক্ষিণ মূর্তির বিশালাকার নানা চিত্র আঁকা রয়েছে। এখানে আট মিটার লম্বা ‘অষ্ট-দিকপালক’-র-( ইন্দ্র, অগ্নি, যম, বরুণ, নৈঋত, বায়ু, ঈশান, কুবের) মূর্তি রয়েছে। ১০০০ বছরের পুরনো মন্দিরটির সর্বত্র রয়েছে ভারতীয় সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও ভাষ্কর্যের ছাপ। মোট ৮১টি নৃত্যেরত ভঙ্গির কারুকাজ দর্শকদের তাক লাগিয়ে দেয়। এছাড়া মন্দিরের ছাদে রয়েছে রঙিন তৈলচিত্র। 


মূল মন্দিরের সম্মুখে এক বিরাট প্রস্তরের মন্ডপ মধ্যে উচ্চ প্রস্তরের বেদীর উপর প্রকান্ড বৃষভদেব উপবেসন করছেন। বৃষটির বিশাল কায়া দৈর্ঘ্যে আঠার এবং উচ্চে বার ফুট , একখন্ড প্রস্তর হতে খোদিত হয়েছে। এঁর ওজন প্রায় পঁচিশ টন বা প্রায় সাত শত মণ। এই মূর্তির বিশালতাই যে কেবল বিস্ময়কর তাই নয়, এর গঠন ভঙ্গিমা , গঠন রীতি ও চক্ষুর রেখাপাত পাথরের বৃষটিকে সজীব করে তুলেছে। বৃষটির চতুর্দিকে ৮ টি স্তম্ভ আছে। তাদের উপরই মন্ডপের গগনচন্দ্রতপ অবস্থিত।
রামেশ্বর ও মহীশূরের চামুন্ডী পর্বতপোরি বৃষমূর্তিও বিরাট কিন্তু তাঞ্জোরের নন্দী মূর্তি সর্বাপেক্ষা বৃহৎ এবং এর শিল্পচাতুর্য্যও অদ্ভুত । 


বিজয়নগরের রাজা কৃষ্ণ রায় মন্দিরটি পুনরায় সংস্কার করেন। স্বাধীন হিন্দু রাজ্যগুলির বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে দেবায়তন গুলি হতশ্রী হয়ে পড়ে। কাঞ্জিবরমের সোমবর্ণ নামক ভাস্কর এই বিশাল দেউল নির্মাণ করেছিলেন। 


মূল মন্দিরের অভ্যন্তরে সুবিশাল গ্রানাইট প্রস্তরের মহাকাল শিব অবস্থান করছেন। প্রায় ত্রিশ ফুট লম্বা, পরিধি পঞ্চাশ ফুট, গ্যালারির মতন দ্বিতল অলিন্দ দিয়ে প্রদক্ষিণ পথ, সেখানে সিঁড়ির সাহায্যে উঠে দেবাদিদেবকে অর্ঘ্য প্রদান করতে হয়। এছাড়াও মন্দির এলাকায় গনেশ, সরস্বতী, মহিষমর্দিনী এবং বিষ্ণুর মন্দির অবস্থান করছে। 


চোল থেকে পাণ্ড‍্য‍, নায়কা, বিজয়নগরের রায় এবং মারাঠারা তাঞ্জোরে একটি দীর্ঘ সময় রাজত্ব করেন । ফলত মন্দিরের কারুকার্যে সকল ধরনের শিল্পের প্রভাব দেখা যায়। তাছাড়া সেসব ভাষার প্রভাবে রাজরাজেশ্বর থেকে ক্রমে মন্দিরের নাম বৃহদীশ্বরে পরিণত হয়েছে।

 
শৈব মতবাদের ভিত্তিতে বৃহদীশ্বর মন্দির নির্মিত হলেও , মন্দির গাত্রে খোদিত মূর্তি গুলিতে বৈষ্ণব এবং শাক্ত দর্শনের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।  কেবল তাই নয় , এই মন্দিরে সকল হিন্দু মতবাদ একত্রে মিলিত হয়ে সনাতনী পরম্পরাকে মান্যতা প্রদান করেছে। পূর্বের প্রবেশ দ্বার ব্যতীত বাকি সকল স্থানে দেব মূর্তির অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়। সকল মুখ্য দেবতা বা দেবীর প্রবেশ দ্বারে দ্বারপালকের অবস্থান লক্ষ্যনীয়। এছাড়াও নর্তকী, মা, অপ্সরা , যক্ষ প্রমুখ মূর্তির সুচারুরূপ অবর্ণনীয়। উপপ্রকোষ্ঠ বা সদর দালানের নিকট তিনটি পাথরের ভাস্কর্য রয়েছে যা জটিলভাবে গ্রানাইট  প্রাচীর গাত্রে খোদিত করা হয়েছে । 


ভূতলস্থ গর্ভগৃহতে নিম্ন লিখিত প্রস্তর মূর্তি দেখা যায় :
পূর্ব প্রাচীর গাত্রে : লিঙ্গোদভব, স্থির ও ধ্যানস্থ শিব, পশুপাতমূর্তি এবং  অর্ধ-মণ্ডপ পথের দিকে আরও দুটি দ্বারপালের মূর্তি দেখা যায়। 
দক্ষিণ প্রাচীর গাত্র : ভিক্ষাটন, বীরভদ্র, দক্ষিণমূর্তি, কালান্তক, নটরাজ, আরও দুটি দ্বারপাল।
পশ্চিম প্রাচীর গাত্র : হরিহর (অর্ধ শিব, অর্ধ বিষ্ণু), লিঙ্গোদভাব, চন্দ্রশেখর, চন্দ্রশেখর প্রভাবলীর সাথে, আরও দুটি দ্বারপাল।
উত্তর প্রাচীর গাত্র : অর্ধনারীশ্বর (অর্ধ শিব, অর্ধ পার্বতী), পার্বতী ব্যতীত গঙ্গাধর, পশুপত-মূর্তি, শিব-আলিঙ্গনা-মুর্তি, এবং দুটি দ্বারপাল।


পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে মন্দিরের অলিন্দে প্রায় ৮১ টি মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের দ্বিতলে শিবের ত্রিপুরানতক রূপের বিভিন্ন ভঙ্গির ভাস্কর্য খোদিত হয়েছে। ত্রয়োদশ তলে শ্রী-বিমান স্তম্ভ অবস্থান করছে।
১৯৫৪ সালে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক ১০০০ টাকার নোট প্রকাশ করে। এই নোটের একদিকে ছিল বৃহদীশ্বর মন্দিরের প্রতিরূপ। 


মূল মন্দিরের উপর তলার উত্তর ও পশ্চিম প্রাচীর গাত্রে যে লিপিমালা উৎকীর্ণ আছে, তাতে রাজরাজ চোল এবং রাজরাজেশ্বর মন্দিরের সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রমাণ সহ তথ্য অবগত হওয়া যায়। এছাড়া, ১০৫৫ খ্রিস্টাব্দে রাজরাজেশ্বর নাটকে আলোচ্য মন্দির সম্পর্কে জানতে পারা যায়।  সাউথ  ইন্ডিয়কন ইন্সক্রিপসন গ্রন্থের ২ য় খণ্ডে বৃহদীশ্বর বা রাজরাজেশ্বর মন্দির সম্পর্কে বিশদে আলোচনা আছে।

দেবতারা খেলা করেন সেখানেই, যেখানে হ্রদ আছে,যেখানে পাতার ছাউনি ভেদ করে সূর্যের আলো এসে পড়ে,এবং যেখানে স্বচ্ছ জলে চলে বেড়ায় হংসের দল।তাদের বুক এখানে ওখানে ছুঁয়ে যায় শ্বেতপদ্ম।যেখানে হংস ও অন্যান্য পাখির ডাক শোনা যায়এবং পশুরা নিকটবর্তী নদীর তীরে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয়।দেবতারা সেখানে খেলা করেন যেখানে নদীর অলংকার হংসের ধ্বনি,জল তাদের বস্ত্র, বহমান সেই জল,কর্ণের কুণ্ডল তীরের পুষ্পিত বৃক্ষরাজি,নদীর মোহনা তাদের ওষ্ঠাধর,উত্থিত বালুচর তাদের স্তন ও হংসপাখা তাদের ক্ষৌমবস্ত্র।দেবতারা সর্বদা খেলা করেন যেখানে বন আছে, নদী আছে, পর্বত ও ঝর্ণা আছে, প্রমোদ-উদ্যানে ভরা নগরী আছে।(বৃহৎসংহিতা)

 
সমাপ্ত
©দুর্গেশনন্দিনী
তথ্যঃ ১. ভারতের দেব দেউল
২. . India: The Ancient Past: A History of the 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.